স্মৃতির লাল-সবুজ লোগো কি বদলে যাবে?

স্মৃতির লাল-সবুজ লোগো কি বদলে যাবে?
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) লোগো
Advertisement
Advertisement

সাড়ে পাঁচ দশকের পুরোনো লাল-সবুজ লোগো। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দর্শকের শৈশবের স্মৃতি, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের গল্প ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারের দীর্ঘ ইতিহাস। হঠাৎ সেই লোগো বদলের উদ্যোগ ঘিরে এখন আলোচনা-সমালোচনার মুখে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)।

গত ৩০ আগস্ট রাতে বিটিভির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে ‘ফিরছে নতুন রূপে বিটিভি’ স্লোগান দিয়ে সাধারণ দর্শক ও ডিজাইনারদের কাছ থেকে নতুন লোগোর ধারণা ও নকশা আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রস্তাবিত নকশা জমা দিতে বলা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গনে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। অনেকে পুরোনো লোগো পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন। আবার কেউ কেউ পুরোপুরি বাদ না দিয়ে বর্তমান লোগোটিকে আধুনিক করার পরামর্শ দিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন বিটিভির মহাপরিচালক কাজী জেসিন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বিটিভির অনুষ্ঠান ও কনটেন্টের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমেছে। সেখান থেকেই প্রতিষ্ঠানটির ‘টোটাল ট্রান্সফরমেশন’-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লোগো নিয়ে ভাবনাটিও সেই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি অংশ।

কাজী জেসিন বলেন, ‘বিটিভির দর্শক দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মানুষ বিটিভির অনুষ্ঠান দেখছে না, প্রোগ্রামের প্রতি আগ্রহও কমে গেছে। তো সেই জায়গা থেকে আমরা বিটিভির টোটাল ট্রান্সফরমেশন যাতে করে বিটিভি মানুষের কাছে আবারও আগের মতো দর্শকপ্রিয় হয়ে ওঠে, সেজন্য কাজ করছি।’

তিনি বলেন, ‘বিটিভির স্ক্রিন পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবে লোগোর বিষয়টিও এসেছে। তবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। মূলত মানুষ কী দেখতে চায়, মানুষ বিটিভিকে কীভাবে দেখতে চায়, সেটারই একটা অংশ হিসেবে লোগো নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে।’

পুরো লোগো পরিবর্তন করা হবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি। তার কথায়, ‘এমন না যে আমরা পুরো লোগো পরিবর্তন করে ফেলব। হয়তো লোগোর রঙে সামান্য পরিবর্তন আনা হতে পারে। অথবা এটিকে আরও একটু আধুনিক ও দেখতে ভালো করার চেষ্টা হতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই করা হলো না।’

লোগোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও জানান কাজী জেসিন। ‘বিটিভির সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তাদের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত এটি সরকারের ইচ্ছার ওপরও নির্ভর করবে। কোন পর্যায়ে পরিবর্তন হবে, কিংবা আদৌ আমরা কোনো পরিবর্তন করব কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি মূলত চিন্তার পর্যায়ে রয়েছে।’

তার দাবি, লোগো নিয়ে আলোচনা বেশি হওয়ায় বিটিভির মূল উদ্যোগ কনটেন্ট উন্নয়নের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। ‘লোগো নিয়ে বেশি আলোচনা হওয়ায় অন্য বিষয়গুলো আলোচনায় আসছে না। যদি কোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে বিটিভির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সম্মানিত শিল্পীদের মতামতও অবশ্যই নেওয়া হবে,’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

কাজী জেসিন আরও বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে বিটিভিতে নিয়মিত কোনো প্রোগ্রামই হয়নি। তাই এই মুহূর্তে আমাদের ফার্স্ট অ্যান্ড ফোরমোস্ট প্রায়রিটি হচ্ছে কনটেন্ট।’

বিটিভির মহাপরিচালক জানান, কনটেন্টের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত বিষয়গুলো নিয়েও কাজ চলছে। তার ভাষায়, ‘বিটিভির স্ট্রাকচারাল, অর্গানোগ্রামসহ প্রতিষ্ঠানটিতে যারা কাজ করছেন, তাদের পেমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়েও আমরা কাজ করছি।’

বিটিভির সদ্য সাবেক ডিজি মাহবুবুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

শিল্পী-কলাকুশলীদের ক্ষোভ

বিটিভির জন্মলগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ অভিনেতা কেরামত মওলা লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। লোগোটির নকশার পেছনের ইতিহাস ও তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কামরুল হাসান, ইমদাদ হোসেন, মুস্তফা মনোয়ারের চিন্তার চেয়ে অর্থবহ লোগো আর হতে পারে না।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বহু শিল্পী, নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মী লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। তাদের ভাষ্য, টেলিভিশনের পর্দার ভেতর থেকে জেগে ওঠা লাল সূর্য শুধু একটি নকশা নয়; প্রতিটি সম্প্রচারে নতুন দিনের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতীকও।

বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক খ ম হারুন বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় জনসম্পত্তি হিসেবে বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক লোগো হঠাৎ কোনো বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বদলে ফেলা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন নির্ভর করে মানসম্মত কনটেন্টের ওপর, শুধু লোগো বদলে তা সম্ভব নয়।’

টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব নওয়াজীশ আলী খানও একই সুরে কথা বলেছেন। তার মতে, ‘বিটিভি সময়ের পরিবর্তন ধরতে পারছে না বহুদিন ধরেই। স্বজনপ্রীতি বাদ দিয়ে দক্ষ জনবল আর নিবেদিত শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভালো অনুষ্ঠান হবে না। শুধু বাজেট বাড়িয়ে নয়, নির্মাণশৈলী, পাণ্ডুলিপির মান আর পরিচালকের রুচি বদলেই বদলাবে বিটিভি।’

পুরোপুরি পরিবর্তনের পক্ষে নন সবাই

লোগো বদলের খবর সামনে আসার পর থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছে বিটিভি। পুরোনো লোগোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শৈশবের স্মৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে অনেক দর্শকই এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তবে সবাই একেবারে পরিবর্তনের বিরোধিতা করছেন না। কেউ কেউ লোগো পুরোপুরি বাদ না দিয়ে আধুনিক করার পরামর্শ দিয়েছেন। দর্শক শেখ ফরিদুল আহমেদ যেমন বর্তমান লোগো বহাল রেখে বিটিভি এইচডি চ্যানেলে সামান্য থ্রিডি ট্রানজিশন যোগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

লোগোর ইতিহাস

বিটিভির বর্তমান লোগোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। সবুজ বেষ্টনীর মধ্যে উদীয়মান লাল সূর্যের এই প্রতীক তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। এর নকশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, ইমদাদ হোসেন, মুস্তফা মনোয়ার ও মহিউদ্দিন ফারুকের মতো বরেণ্য শিল্পী।

১৯৮০ সালে বিটিভি রঙিন সম্প্রচারে যাওয়ার সময় লোগোটির রঙিন রূপ ব্যবহার শুরু হয়। এরপর সাড়ে পাঁচ দশক ধরে এই প্রতীকই বিটিভির পরিচয় বহন করে আসছে। সময়ের সঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে দর্শকের আবেগ ও স্মৃতিরও অংশ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর