কুড়িগ্রামের রৌমারীতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সেতুর সংযোগ সড়কের কাজ পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি। সেতু দুটির মূল কাঠামো তৈরি হলেও দুই পাশের সংযোগ ও গাইড ওয়ালের কাজ পড়ে আছে অসমাপ্ত। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজও বন্ধ।
এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ। কৃষকের উৎপাদিত ফসল সময়মতো বাজারে নিতে পারছেন না অনেকে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতেও সমস্যা হচ্ছে। জরুরি সময়ে মুমূর্ষু রোগী কিংবা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিতে গিয়েও পড়তে হচ্ছে বিপাকে।
সীমান্ত এলাকায় এর প্রভাব পড়ছে আরও বেশি। সংযোগ সড়ক অসম্পূর্ণ থাকায় টহলরত বিজিবির গাড়ি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর সেতু নির্মিত হলেও সেটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারায় ক্ষোভ বাড়ছে তাদের মধ্যে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন চলে গেছেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নির্মাণস্থলে কোনো শ্রমিক বা যন্ত্রপাতি দেখা যায়নি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাশিয়াবাড়ি এলাকায় ৯৬ মিটার দীর্ঘ একটি পিসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট। এমবিইউ-জেভিজি-৪ ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেড (বনশ্রী) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১১ কোটি ৬০ লাখ ৫৭ হাজার ৪০৩ টাকা ব্যয়ে সেতুটির কাজ পায়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের ৩০ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
একই সড়কের প্রায় এক হাজার গজ দূরে বাওয়াইর গ্রামের খালের ওপর ৬০ মিটার দীর্ঘ আরেকটি পিসি গার্ডার সেতুর কাজও পায় একই প্রতিষ্ঠান। এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ৩০ আগস্ট। ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট।
কিন্তু ২০২৬ সালের আট মাস পেরিয়ে গেলেও দুই সেতুর দুই পাশের সংযোগকাজ শেষ হয়নি। অর্থাৎ, একটি সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার বছর পরও এবং অন্যটির কাজ নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন বছর পরও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতু দুটির মূল কাঠামো তৈরি হলেও দুই পাশে গাইড ওয়াল ও সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হয়নি। নির্মাণস্থলে পড়ে আছে অসমাপ্ত কাজের চিহ্ন। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো শ্রমিক বা নির্মাণযন্ত্র নেই।
প্রায় চার মাস আগে সেতুর সংযোগ সড়কের খাদে পড়ে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হাসমত আলী আহত হন। তার পা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এখন তিনি বাড়িতে চিকিৎসাধীন।
মনিরা বেগম বলেন, ‘আমরা বাড়িঘর ভেঙে সেতু করার জন্য জায়গা দিয়েছি। আমাদের পরিবারকে কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও দেওয়া হয়নি। সেতু নির্মাণের অনেক পরে ওঠা-নামার জন্য সামান্য ব্যবস্থা করে দিলেও প্রায় পাঁচ বছর ধরে কাজ অসমাপ্ত।’
বাওয়াইর গ্রামের ভ্যানচালক আব্দুস সবুর মিয়া বলেন, ‘সেতু নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশ দিয়ে গাড়ি নিয়ে ওঠা-নামার কোনো উপায় ছিল না। মানুষ কোনোমতে পায়ে হেঁটে চলাচল করত। নানা অভিযোগের পর কিছুদিন আগে গাড়ি ওঠানামার মতো করে দিলেও কাজ শেষ হয়নি। কাজ শেষ না করে ঠিকাদার চলে গেছে।’
ইজিবাইকচালক মোত্তাবিল বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এই সেতুর ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করি। সবসময় আতঙ্কে থাকি, সেতুতে উঠতে-নামতে কখন দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় গাড়ি ভেঙে যায়, যাত্রীরা আহত হন।’
কাজ কেন শেষ হয়নি, এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমবিইউ-জেভিজি-৪ ইস্টার্ন হাউজিং লিমিটেডের (বনশ্রী) বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে ফোন না ধরায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রৌমারী উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। আশা করি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতু দুটির অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করা হবে।’


