বৈঠার ছন্দ, সারিগানের সুর আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠেছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা। প্রায় ৫০ বছর পর উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন সুরমা নদীতে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। হাওরের বুকে হারিয়ে যেতে বসা এই লোকজ উৎসব দেখতে নদীর দুই তীরে ও নৌকায় জড়ো হন কিশোরগঞ্জসহ আশপাশের জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ।
শনিবার সকাল থেকেই সুরমা নদীর দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। পাশাপাশি সহস্রাধিক ছোট-বড় নৌকায় করে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে নৌকায় বসে উপভোগ করেন মাঝিদের বৈঠার ছন্দে ছুটে চলা নৌকার রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা।
আয়োজকদের দাবি, বিকাল পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে দর্শনার্থীরা নৌকাবাইচ দেখতে আসেন।
দুপুর ১২টার দিকে শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। এতে ১২টি নৌকা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতা ঘিরে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নৌকায় থাকা দর্শনার্থীরা করতালি ও স্লোগানে প্রতিযোগীদের উৎসাহ দেন।
স্থানীয়দের মতে, কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকাবাইচের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার প্রভাবে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিল। ইটনায় সর্বশেষ প্রায় অর্ধশতক আগে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দীর্ঘ বিরতির পর এবার আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো ঐতিহ্য আবারও প্রাণ ফিরে পেল।

ধনপুর এলাকার বাসিন্দা জিতেন্দ্র দাস বলেন, নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি গ্রামবাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। আধুনিকতার প্রভাবে জারি, সারি, ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলাসহ নানা লোকজ আয়োজন হারিয়ে যাচ্ছে। তাই প্রতিবছর এমন আয়োজন করা প্রয়োজন।
পাশের নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার বাসিন্দা মোবাশ্বির ফয়সাল জীবনে প্রথমবার নৌকাবাইচ দেখতে এসে বলেন, ছোটবেলা থেকেই মুরব্বিদের কাছে নৌকাবাইচের রোমাঞ্চের গল্প শুনেছেন। এবার মামার বাড়ির পাশেই সুরমা নদীতে আয়োজন হওয়ায় বন্ধুদের নিয়ে ছোট নৌকায় করে প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছেন।
তিনি বলেন, হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে এ আয়োজন উপভোগ করে দারুণ লাগছে। হাওরের প্রতিটি এলাকায় প্রতিবছর এমন নৌকাবাইচ আয়োজন করা উচিত।
হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের উৎসাহে ধনপুর ইউনিয়নবাসী এ নৌকাবাইচের আয়োজন করে।
প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় সোনার হরিণ, দ্বিতীয় পুরস্কার রুপার ময়ূর এবং তৃতীয় পুরস্কার এলইডি টেলিভিশন। বিজয়ী নৌকার মালিকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান।

ফজলুর রহমান বলেন, নৌকাবাইচ ভাটিবাংলার প্রাণের উৎসব। প্রায় ৫০ বছর পর এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাও এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, নৌকাবাইচ দেখতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে। হাওরের মানুষ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে এ আয়োজন উপভোগ করেছেন এবং সুশৃঙ্খলভাবে অনুষ্ঠান শেষ করেছেন। হাওরের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছর নৌকাবাইচ আয়োজন করা হবে।
আয়োজক কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমেশ চন্দ্র গোপ বলেন, সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ নৌকা নিয়ে সুরমা নদীর দুই পাড়ে ভিড় করেন। দুপুরের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। এত মানুষের সমাগম হবে, তা তারা ভাবতেও পারেননি।
অনুষ্ঠানে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ ভিপি সোহেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম রতনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


