কলম্বিয়ায় ভূমিকম্প নতুন কোনো ঘটনা নয়। দেশটির ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এমন যে সেখানে প্রায় প্রতিদিনই মাটির নিচে কম্পন তৈরি হয়। গত সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে–কলম্বিয়ায় এত বেশি ভূমিকম্প হয় কেন?
কলম্বিয়ান জিওলজিক্যাল সার্ভিসের (এসজিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। অর্থাৎ দিনে প্রায় ৮০টি। তবে অধিকাংশ ভূমিকম্প এত দুর্বল যে মানুষ তা টের পান না। সেগুলো শনাক্ত হয় ভূকম্পন মাপার যন্ত্রে।
সোমবারের ভূমিকম্পটি ছিল ভিন্ন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) হিসাবে, এর উপকেন্দ্র ছিল রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয় ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০৭ কিলোমিটার গভীরে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি পরাঘাত বা আফটারশকও রেকর্ড হয়।
এসজিসি বলেছে, এটি ২১ শতকে কলম্বিয়ায় রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পটির প্রভাবও ছিল ব্যাপক। পশ্চিম কলম্বিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়ে, মানুষ আটকা পড়েন এবং উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়। পেরেইরায় বিমানবন্দরের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বেশ কয়েকটি ভবন ধসে পড়ার কথা জানান।
তবে এই ভূমিকম্পকে বোঝার জন্য শুধু এই ঘটনাটির দিকে তাকালে হবে না। এর উত্তর রয়েছে কলম্বিয়ার ভূগর্ভে।
তিন টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার ভূমিকম্পপ্রবণতার প্রধান কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে দেশটির আশপাশে নাজকা, দক্ষিণ আমেরিকান ও ক্যারিবীয় টেকটোনিক প্লেট পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করছে।
টেকটোনিক প্লেট হলো পৃথিবীর বাইরের শক্ত স্তরের বিশাল অংশ। এগুলো অত্যন্ত ধীরে ধীরে সরে যায়। দুটি প্লেট পরস্পরের দিকে এগোলে, একটির নিচে অন্যটি ঢুকে গেলে বা পরস্পরের পাশ দিয়ে সরে গেলে শিলাস্তরে চাপ জমতে থাকে। সেই চাপ হঠাৎ মুক্ত হলে ভূমিকম্প হয়।
কলম্বিয়ার পশ্চিমে এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নাজকা প্লেটের দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের নিচে ঢুকে যাওয়া। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সাবডাকশন।
প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের গভীর খাত এবং আন্দিজ অঞ্চলের পর্বত ও আগ্নেয়গিরি গঠনের সঙ্গেও এই ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে উত্তরে ক্যারিবীয় প্লেটের গতিবিধি কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে আরও জটিল করেছে। ফলে দেশের ভূমিকম্পের উৎস কোনো একটি সরল সীমারেখায় আটকে নেই। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন গভীরতা ও ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে ভূমিকম্পের সম্পর্ক রয়েছে।
কলম্বিয়ার ভেতরেও আছে সক্রিয় ফল্ট
ভূমিকম্পের কারণ শুধু টেকটোনিক প্লেটের সীমান্ত নয়। প্লেটগুলোর চলাচলে তৈরি চাপ মহাদেশের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই চাপের একটি অংশ ভূত্বকের বিভিন্ন সক্রিয় ফল্ট বা ভূতাত্ত্বিক ফাটলের মাধ্যমে মুক্ত হয়।
কলম্বিয়ায় উল্লেখযোগ্য সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে সান্তা মার্তা-বুকারামাঙ্গা, আলজেসিরাস, গারাপাতাস ও ইবাগে ফল্ট ব্যবস্থা। এ ছাড়া, আন্দিজ পর্বতমালা ও তার আশপাশে আরও বহু সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে।
ফল্ট হলো ভূত্বকের এমন একটি দুর্বল অঞ্চল, যার দুই পাশে থাকা শিলা পরস্পরের তুলনায় সরে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে চাপ জমার পর হঠাৎ স্থানচ্যুতি ঘটলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থাৎ, কলম্বিয়ার ভূমিকম্পপ্রবণতার পেছনে একই সঙ্গে কাজ করছে প্লেটের পারস্পরিক সংঘাত, নাজকা প্লেটের সাবডাকশন এবং দেশের ভেতরের সক্রিয় ফল্ট ব্যবস্থা।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল দেশের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এখানেই নাজকা প্লেট দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এই সাবডাকশন অঞ্চল বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা তৈরি করে।
এসজিসির ভূমিকম্প ঝুঁকি বিশ্লেষণেও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলকে উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ইয়ানোস সীমান্ত এবং আরাউকা, সান্তান্দের ও নর্তে দে সান্তান্দের এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকি রয়েছে।
তবে কোনো এলাকায় বেশি ভূমিকম্প হয় মানেই সেখানে বারবার বড় ভূমিকম্প হবে, এমন নয়। কলম্বিয়ায় প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক ভূমিকম্প রেকর্ড হয়, তার অধিকাংশই ছোট।
বুকারামাঙ্গা সিসমিক নেস্ট
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সবচেয়ে অস্বাভাবিকগুলোর একটি হলো বুকারামাঙ্গা সিসমিক নেস্ট। এটি সান্তান্দের বিভাগের লস সান্তোস এলাকার নিচে অবস্থিত একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল।
এসজিসির তথ্য অনুযায়ী, কলম্বিয়ায় রেকর্ড হওয়া ভূমিকম্পের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এই অঞ্চলে ঘটে।
এখানকার অধিকাংশ ভূমিকম্প ছোট এবং অনেকগুলোই গভীরে সংঘটিত হয়। ফলে এত বিপুলসংখ্যক ভূমিকম্প হলেও সাধারণ মানুষ সেগুলোর বেশির ভাগ অনুভব করেন না।
এখন কি আগের চেয়ে বেশি ভূমিকম্প হচ্ছে?
ভূমিকম্পের খবর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি চোখে পড়ে। এর একটি কারণ প্রযুক্তি। উন্নত ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখন অনেক ছোট কম্পনও শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক সংবাদব্যবস্থার কারণে সেই তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
তাই ভূমিকম্পের খবর বেশি পাওয়া মানেই ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে গেছে, এমন নয়।
এসজিসির জাতীয় ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দিনরাত দেশের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র কম্পন থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প সবই শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা হয়।
কলম্বিয়ায় প্রতিদিন কয়েক ডজন ভূমিকম্প রেকর্ড হওয়া অস্বাভাবিক কোনো নতুন ঘটনা নয়। এটি দেশটির ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা। তবে সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, এই দীর্ঘস্থায়ী ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা কখনো কখনো বড় দুর্যোগেও রূপ নিতে পারে।
কলম্বিয়ার ইতিহাসে বড় ভূমিকম্প
কলম্বিয়ার ইতিহাসে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী ভূমিকম্প রয়েছে।
১৯০৬: ইকুয়েডর-কলম্বিয়া ভূমিকম্প
৩১ জানুয়ারি ১৯০৬ সালে কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে।
এটি কলম্বিয়াকে প্রভাবিত করা সবচেয়ে বড় রেকর্ডকৃত ভূমিকম্প। এর সঙ্গে শক্তিশালী সুনামিও সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয় এবং ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মানুষ প্রাণ হারান।
১৯৭৯: তুমাকো ভূমিকম্প
১২ ডিসেম্বর ১৯৭৯ সালে কলম্বিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। তুমাকো ও আশপাশের এলাকায় এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে এবং সুনামিও সৃষ্টি হয়।
১৯৯৯: আর্মেনিয়া ভূমিকম্প
২৫ জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প কলম্বিয়ার পশ্চিম-মধ্য অঞ্চলে অবস্থিত কুইন্দিও ডিপার্টমেন্টের রাজধানী আর্মেনিয়া ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
শুধু আর্মেনিয়া শহরেই ৯২১ জন নিহত এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। ২১ হাজারের বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।
এই ভূমিকম্প একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও দেখিয়ে দেয়। ক্ষয়ক্ষতি শুধু ভূমিকম্পের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। ভূমিকম্প কতটা গভীরে হয়েছে, জনবসতি কত ঘন, ভবন কতটা শক্তিশালী এবং উৎপত্তিস্থলের কতটা কাছে, এসব বিষয়ও প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে।


