প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি এলেই আমরা আবেগে ভাসি, প্রভাতফেরিতে যাই, শহীদ মিনারে ফুল দিই। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে একুশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার মতো শক্তিশালী পিরিয়ড ড্রামা বা গবেষণাভিত্তিক ঐতিহাসিক সিনেমা এখনো হাতেগোনা।
অমর একুশকে কেন্দ্র করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হয়েছে মাত্র তিনটি—‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘বাঙলা’ এবং ‘ফাগুন হাওয়ায়’। স্বাধীনতার আগে জহির রায়হান ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে একটি ছবি বানাতে চেয়েছিলেন। সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় পারেননি।
১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জীবন থেকে নেয়া’ পরিচালনা করেন জহির রায়হান। এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, বিপ্লবের প্রতীক। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের দমনপীড়নের সময়ে তিনি একটি পরিবারের ভেতরের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বৈরতন্ত্রকে তুলে ধরেন। পরিবারের প্রধান নারী চরিত্রকে স্বৈরাচারী শাসকের প্রতীক হিসেবে দেখান। আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি এবং একুশের প্রভাতফেরির দৃশ্যও এ ছবিতে প্রথমবারের মত দেখানো।
স্বাধীনতার প্রায় ৩৫ বছর পর ভাষা আন্দোলনভিত্তিক দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘বাঙলা’ নির্মিত হয়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার উপন্যাস ‘ওঙ্কার’ অবলম্বনে এটি পরিচালনা করেন শহীদুল ইসলাম খোকন। এতে এক বাক্প্রতিবন্ধী মেয়ের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার সামাজিক বাস্তবতা এবং পাকিস্তানি দোসরদের শোষণচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন শাবনূর।
অন্যদিকে, ভাষা আন্দোলনের চিত্রায়ণ যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা-কেন্দ্রিক, সেখানে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ আমাদের নিয়ে যায় ১৯৫২ সালের এক মফস্বল শহরে। ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন তৌকীর আহমেদ। এটি নির্মিত হয়েছে টিটো রহমানের ছোটগল্প ‘বউ কথা কও’ অবলম্বনে। গল্পে দেখা যায়, পাকিস্তানি এক পুলিশ কর্মকর্তা যখন বাংলাভাষী মানুষের ওপর জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন এক সাধারণ তরুণ ভাষা ও মাটির টানে প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যায়।
একুশের মতো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়কে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রভিত্তিক নির্মাণ কেন এত সীমিত— এ প্রশ্ন থেকেই যায়। আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পে গবেষণা, বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ঘটলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আরও বিস্তৃত, নানামাত্রিক ও আন্তর্জাতিক মানের কাজ সম্ভব।


