তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, সম্প্রতি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিসর যোগ দিতে পারে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত।
আল জাজিরার আরবি চ্যানেলের ‘আল মুকাবালা’ অনুষ্ঠানের জন্য দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে স্থানীয় সময় রবিবার প্রচারিতব্য ওই বক্তব্যে এরদোয়ান এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কোনও সদস্য দেশ বাইরের হামলার শিকার হলে অন্য সদস্যরা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
এরদোয়ান বলেন, ‘এই চুক্তি বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা দিয়েছে।’ তিনি জানান, ভবিষ্যতে চুক্তির পরিধি বাড়ানোর সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর একটি হলো মিসরের অংশগ্রহণ।
‘মক্কা চুক্তি’ নামেও পরিচিত এই চুক্তি গত শুক্রবার পবিত্র মক্কা নগরীতে সই হয়। এতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনও একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। সম্মিলিত প্রতিরোধের এই বিধানকে বিশ্লেষকেরা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এটিকে ন্যাটোর সমতুল্য বা কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে চুক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
আল জাজিরার সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে ছিল হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা এবং সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের যুদ্ধ।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া আঙ্কারার অগ্রাধিকার। প্রণালিটি বন্ধ থাকলে কারও স্বার্থ রক্ষা হবে না। আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
এরদোয়ান বলেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে তুরস্ক প্রতিবেশী দেশগুলোকে একা ছেড়ে যাবে না। তিনি সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে তুরস্ক সম্ভাব্য সবকিছু করবে বলে জানান এরদোয়ান। তিনি দেশটি সফরের পরিকল্পনার কথাও জানান। সিরিয়ার কুর্দিরাও ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অংশীদার হবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। অঞ্চলজুড়ে কুর্দি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার এবং তাদের অধিকার রক্ষায় তুরস্ক কাজ করবে বলেও জানান।
গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক ‘গাজাকে একা ছেড়ে যেতে পারে না’। গাজার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে বলে জানান তিনি। তার দাবি, হামাস আন্তরিকভাবে নিজেদের প্রতিশ্রুতি পালন করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবানন প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, দেশটিতে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা আঙ্কারার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্ক সফরের সময় তিনি লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন। যুদ্ধ বন্ধে ওয়াশিংটনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সুদানের প্রতি তুরস্কের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান এরদোয়ান। দেশটির সার্বভৌমত্ব পরিষদের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো বলেও জানান তিনি।
লিবিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে বলে মন্তব্য করেন এরদোয়ান। দেশটিকে তুরস্ক ছেড়ে যাবে না বলেও জানান তিনি।
ইউরোপ প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্ককে সদস্য করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। তুরস্কের জন্য এখন আর ইইউ সদস্যপদ অগ্রাধিকার নয়। এর ফলে ‘ইউরোপই ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এরদোয়ান আরও বলেন, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।
রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ২০১৯ সালে তুরস্ককে বহুজাতিক এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়। ওয়াশিংটনের দাবি ছিল, এস-৪০০ ব্যবস্থা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গোপন প্রযুক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে এরদোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, তার প্রশাসন এস-৪০০ কেনার কারণে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তুরস্কের ওপর আরোপ করা সিএএটিএসএ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। তিনি আরও বলেন, এফ-৩৫ কর্মসূচিতে তুরস্কের ফিরে আসার বিষয়টি ‘অবশ্যই বিবেচনা করা হবে’।
তবে এফ-৩৫ বিক্রির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসে এখনও বিরোধিতা রয়েছে। ২০২০ সালের একটি আইনে বলা হয়েছে, তুরস্ক এস-৪০০ ব্যবস্থা ধরে রাখলে পেন্টাগন দেশটির কাছে এফ-৩৫ হস্তান্তর করতে পারবে না।


