নাগরিকদের ওপর নতুন কোনো কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বৃদ্ধি ছাড়াই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৯ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৫ টাকা ৮১ পয়সার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)।
মঙ্গলবার বিকালে নগর ভবনের সিটি হল রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আয় ও ব্যয় সমপরিমাণ ধরে এই বাজেট ঘোষণা করেন রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন।
প্রশাসক জানান, নাগরিকদের স্বস্তি বজায় রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম ও সেবার মানোন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবসম্মত এই বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৮০৬ কোটি ৬১ লাখ ২১ হাজার ২১১ টাকা ৩৬ পয়সা। সংশোধিত বাজেটে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩৪ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার ৪২৩ টাকা ৪৯ পয়সা। নতুন অর্থবছরে বাজেটের আকার বেড়ে ১ হাজার ৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রাসিকের ছয়টি বিভাগের কার্যক্রম, চলমান প্রকল্প এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই প্রশাসনের লক্ষ্য বলে জানান প্রশাসক।
স্বাস্থ্য খাতে সিটি হাসপাতালের আধুনিকায়ন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে চারটি অ্যাম্বুলেন্স ও দুটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনসহ জনবহুল এলাকায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, আধুনিক শৌচাগার এবং নামাজের স্থান নির্মাণ করা হবে।
রাজস্ব খাতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হোল্ডিং ট্যাক্সে ৯০ শতাংশ ছাড় বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, দোকান ভাড়া, অটোরিকশা ও চার্জার রিকশার লাইসেন্স ফিসহ বিভিন্ন বকেয়া রাজস্ব ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিশোধে ১৫ শতাংশ সারচার্জ মওকুফের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ছাদবাগানকে উৎসাহিত করতে হোল্ডিং ট্যাক্সে ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে।
পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার লক্ষ্যে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বর্জ্য থেকে সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং মশক নিধনে নতুন ফগিং মেশিন ও কীটনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকৌশল বিভাগের অধীনে ৩০টি ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ, সৌন্দর্যবর্ধন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ এবং নাগরিক তথ্যসেবা কেন্দ্র চালু করা হবে। নির্মাণাধীন পাঁচটি ফ্লাইওভারের মধ্যে হড়গ্রাম, বিলসিমলা ও বন্ধগেট রেলক্রসিং এলাকার তিনটির কাজ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে।
স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে নগরীর বিভিন্ন স্থানে হাইমাস্ট লাইট ও পদ্মা পাড় এলাকায় গার্ডেন লাইট স্থাপন, সোনাদিঘি ও অন্যান্য জলাশয়ে আধুনিক ফোয়ারা নির্মাণ, ১৫৫টি স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ফুটপাত দখলমুক্তকরণ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় পদ্মা নদীর চরে পাখির অভয়ারণ্য, রিভার ড্রাইভওয়ে, আউটার রিং রোড, সিটি গেট নির্মাণ, আধুনিক বাস ও ট্রাক টার্মিনাল, ইনডোর স্টেডিয়াম এবং আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে ২ হাজার শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বায়োডাইভারসিটি পার্ক, পদ্মা নদীকেন্দ্রিক পর্যটন উন্নয়ন, রেলওয়ে বাইপাস, আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টার এবং বর্ধিত নগর এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন।
রাসিক প্রশাসক জানান, সিটি করপোরেশনের ২০৭টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে। সবুজায়নের অংশ হিসেবে আগামী এক বছরে আড়াই লাখ গাছের চারা রোপণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রথম ধাপে ৫৩ হাজার চারা রোপণ শুরু হয়েছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পদক দেওয়া, ফ্রিল্যান্সিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণের কথাও জানানো হয়। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন, প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনা এবং গম্ভীরা ও আদিবাসী সংস্কৃতির প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম, বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউন্সিলর ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


