বিদ্যুতের অভাবে তীব্র লোডশেডিংয়ের মাঝেই ফেনী জেলা শহর ও আশপাশের পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অসংখ্য অবৈধ চার্জিং গ্যারেজ। অনুসন্ধানে জেলাজুড়ে এমন প্রায় ১৮৩টি চার্জিং পয়েন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে প্রতিদিন শত শত অটোরিকশা অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ ও হুকিংয়ের মাধ্যমে চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনই স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় পড়ছে অতিরিক্ত চাপ।
শহরের শান্তি কোম্পানির রোড, নাজির রোড, সাহেব বাজার, শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক, একাডেমি, উকিলপাড়া, বিরিঞ্চি, মহিপাল ও পাঠানবাড়ী রোডসহ শহরের বাইরে বিভিন্ন ইউনিয়নে এসব গ্যারেজ ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাসাবাড়ি বা দোকানের বৈধ মিটারের আড়ালে বিদ্যুতের বৈধ সংযোগ বাইপাস করে অতিরিক্ত লোড নেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সরাসরি অবৈধ হুকিং চালানো হচ্ছে।
কোনো ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই খোলা জায়গায় দিনরাত এসব চার্জিং কার্যক্রম চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব অবৈধ সংযোগ টিকে আছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, এসব অভিযোগের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ফেনীর সামগ্রিক লোডশেডিংয়ের পেছনে জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ ও উৎপাদনসহ নানা কারণ থাকলেও, সন্ধ্যা ও রাতে যখন আবাসিক চাহিদা তুঙ্গে থাকে তখন হাজার হাজার রিকশা একযোগে চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিতরণ লাইনে মারাত্মক চাপ তৈরি হয়।
অবৈধ চার্জিংয়ের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত এসব যানবাহনের কারণে শহরের সড়কগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট ও দুর্ঘটনা। ফেনী পৌরসভার বাসিন্দারা জানান, সাধারণ প্যাডেল রিকশার পৌরসভার নম্বর প্লেট থাকলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বড় অংশের কোনো বৈধ নম্বর বা অনুমোদন নেই। ফলে পৌরসভা মোটা অঙ্কের সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সড়কে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) শাহাদাত হোসেন জানান, গত চার মাসে অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অভিযান চলমান রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে সতর্ক বার্তা দিয়ে ফেনী বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ কান্তি মজুমদার বলেন, অবৈধ গ্যারেজ ও বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় শিগগিরই বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা মাস্টাররোলের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো গ্রাহক বৈধ মিটার থেকে চার্জ দিলে সেটাকে অবৈধ বলা যাবে না। আর যে যানবাহনে চার্জ দেওয়া হয় সেটি বৈধ না অবৈধ তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
অন্যদিকে ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন জানান, পৌর এলাকায় অবৈধ অটোরিকশা চলাচল ও রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। খুব দ্রুত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত একটি রিকশা চার্জ দিতে প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়।
ফেনীসহ সারা দেশেই অনিয়ন্ত্রিত এসব যানবাহন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়কশৃঙ্খলা এবং রাজস্ব—তিনটি খাতেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর সমাধানের জন্য অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি সমন্বিত নজরদারি ও একটি পৃথক বিদ্যুৎ নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


