ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করায় বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, মাদুরোকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয়েছে। সেখানেই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার বিচার হবে।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন উঠেছে, কোনো দেশের ভেতরে আক্রমণ করে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে আটক করে দেশ থেকে বাইরে নিয়ে আসা কতটা বৈধ?
ট্রাম্প-মাদুরো বৈরিতার কারণ
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়েই মাদুরো সরকারের বিরোধিতা শুরু করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে মাদক বহনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় ভেনেজুয়েলার বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালানো শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ভেনেজুয়েলার কাছে মোতায়েন করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ। ৩০টির বেশি হামলায় হত্যা করা হয় এসব জাহাজে থাকা শতাধিক মানুষকে।
তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ উল্লেখ করে নিন্দা জানায় জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।
তবে তাতে পরোয়া করেননি ট্রাম্প। মাদুরোকে ক্ষমতা ছাড়তে আহ্বান জানিয়ে তিনি দাবি করেন, মাদুরো ও তার সরকার এমন মাদক চক্রকে সমর্থন করেছেন যারা ওয়াশিংটন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং মাদকের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে হাজারও তরুণ-তরুণীর মৃত্যুর জন্য দায়ী।

এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন নিকোলাস মাদুরো। তিনি দাবি করেন, বিরোধী দলের নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ‘মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে’ ক্ষমতায় আনতেই তার সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে মার্কিন প্রশাসন।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভেনেজুয়েলায় মাদুরো সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেন ট্রাম্প। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরেও ছোট পরিসরে হামলা চালায় পেন্টাগন।
তারই ধারাবাহিকতায় শনিবার ভোরে দেশটির রাজধানী কারাকাসে বড় পরিসরে হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে স্ত্রীসহ আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে আসে মার্কিন সেনারা।
ট্রাম্প তার সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আটক মাদুরোর ছবি প্রকাশ করে কারাকাসে মার্কিন হামলাকে সফল অভিযান হিসেবে প্রশংসা করেন।
যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে এই অভিযানকে বৈধ দাবি করছে
ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে হাজারও নাগরিককে হত্যার অভিযোগ এনে মার্কিন বিচার বিভাগ মাদুরোকে আটকের জন্য সামরিক সহায়তা চেয়েছিল। নিউইয়র্কের এক গ্র্যান্ড জুরি মাদুরো, তার স্ত্রী ও ছেলে, দুই রাজনৈতিক নেতা এবং কথিত মাদক কার্টেলের এক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, মাদক ও অস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘অভিযুক্তরা “খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী” বিচারের মুখোমুখি হবে।’
মাদুরোকে আটকের পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তেল স্বার্থ ‘চুরি’ করার অভিযোগ এনে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সব স্বার্থ ফিরিয়ে আনা হবে।’
তিনি জানান, কিছু সময়ের জন্য ভেনেজুয়েলা শাসন করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

এদিকে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই অভিযান চালিয়ে একদিকে আইন প্রয়োগমূলক পদক্ষেপ, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সূচনা উল্লেখ করে আইনি বিষয়গুলোকে জটিল করে তুলেছে।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ জেরেমি পল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ‘আপনি একদিকে এটিকে আইন প্রয়োগ অভিযান আখ্যা দিয়ে, অন্যদিকে সেই দেশ শাসন ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন না। এর কোনো যুক্তিযুক্ত অর্থই হয় না।’
যুক্তরাষ্ট্রের আইন কী বলে?
কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের কংগ্রেস কক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে। তবে প্রেসিডেন্ট হলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সীমিত পরিসরে এবং জাতীয় স্বার্থে তিনি কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন।
ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস গত বছর ভ্যানিটি ফেয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার “ভূখণ্ডে কোনো কার্যক্রম” অনুমোদন করতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।’
অর্থাৎ ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের আগে ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন পেয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মার্কিনপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, শনিবারের অভিযানের আগে কংগ্রেসকে জানানো হয়নি। তার কথা সত্য হলে, ট্রাম্প দেশের সংবিধানবিরোধী কাজ করেছেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক কোনো সম্পর্কে বলপ্রয়োগ সাধারণত নিষিদ্ধ। বিশেষ পরিস্থিতিতে কেবল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন বা আত্মরক্ষার ব্যতিক্রম ছাড়া এক দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরে হামলা চালাতে পারে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক পাচার ও গ্যাং সহিংসতা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বটে, তবে এগুলো কোনো সশস্ত্র সংঘাত নয়। এসব অপরাধের অভিযোগ এনে কোনো দেশের ভেতরে সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়া যাবে না।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ ওয়াক্সম্যান বলেন, ‘কেবল একটি ফৌজদারি অভিযোগ “বিদেশি সরকার উৎখাতে” সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত এই হামলাকে “আত্মরক্ষার তত্ত্বের” ওপরও দাঁড় করাতে চাইবে।’
এমন হামলার আর কোনো নজির আছে?
যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অপরাধী সন্দেহে বিভিন্ন নেতাকে আটক করেছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্মতি ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারকে ‘অবৈধ নেতা’ উল্লেখ করলেও তার বদলে অন্য কাউকে সরকার প্রধান বা নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। কাজেই তারা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে মাদুরোকে আটকের অনুমতি পায়নি।

১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র পানামার তৎকালীন নেতা জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটক করে। তার বিরুদ্ধেও মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি, পানামার সামরিক বাহিনী মার্কিন সেনাকে হত্যা করায় আত্মরক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে নরিয়েগাকে আটক করা হয়। তবে সে সময় নরিয়েগাকে ‘অবৈধ নেতা’ ঘোষণা করলেও নির্বাচনে পরাজিত বিরোধী এক প্রার্থীকে দেশের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ওয়াশিংটন।
এ ছাড়া ২০২২ সালে হন্ডুরাসের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়। পরে তিনি মাদক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড পান। ট্রাম্প ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবলে ক্ষমা করেন।


