সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুজন বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় রোববার ভোরে দেশটির সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানায়। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের এই হামলার জন্য দায়ী করেছে সৌদি জোট।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় এলাকায় এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। সম্প্রতি হুথি ও সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারি বাহিনীর লড়াই তীব্র রূপ নিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের টার্মিনাল ৩ ও ৪-এ আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্রটি।
সৌদি সরকারের বিবৃতিতে জানানো হয়, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক ছাড়াও দুজন বাংলাদেশি, একজন ফিলিস্তিনি, একজন মার্কিন, একজন মিসরীয়, একজন জর্ডানি, একজন সিরীয় ও একজন সুদানি রয়েছেন। আহতরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও বিশ্লেষণ করে বার্তা সংস্থা এপি জানায়, হামলার পর বিমানবন্দরের বাইরে অন্তত একটি অ্যাম্বুলেন্স ও গাড়ি দেখা গেছে।
গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরটিতে একাধিক হামলা হলো। হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল সৌদি আরব। তবে এই ঘটনার পর সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্রদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে দেশটি।
শনিবার বিকালে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়া উচিত কি না, তা ভাবা হচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতেও পারি। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
পরে ট্রাম্প জানান, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি। সৌদিতে যা ঘটেছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত হবে কি না—প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তা সময়ই বলে দেবে।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হামলায় এক মার্কিন নাগরিক মারা গেছেন। জঘন্য এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান তিনি।
হামলার পেছনে হুতিদের দায়ী করে সৌদি জোট এটিকে ‘পুরো যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যা দেয়। একই সঙ্গে এর কড়া জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা। তবে বিমানবন্দরে কোনো সামরিক স্থাপনা ছিল না।
হুতিদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে শনিবার সকালে সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার অভিযোগ তোলে তারা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে এই বিমানবন্দরে আরেক হামলায় এক পাইলটসহ তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন। হুথিদের দাবি ছিল সেটি তাদের কাজ। নতুন করে সৌদি জোট বড় অভিযান শুরুর পর বিমানবন্দর, সামরিক স্থাপনা ও তেল অবকাঠামোতে হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে তারা।
শনিবার সকালে সৌদি কর্তৃপক্ষ বিমানবন্দরটির কার্যক্রম স্থগিত করে। চারপাশ ঘিরে ফেলে ভারী পুলিশ, নিভিয়ে দেওয়া হয় ভেতরের আলো। ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইটরাডার২৪ জানায়, সব ফ্লাইট বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দরটি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়।
এদিকে ওমান উপসাগরে নিখুঁত নিশানার অস্ত্র দিয়ে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ অকেজো করার দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম)। ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ ধরে রাখার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি ওশান মলিকা’ জাহাজটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। নাবিকেরা অক্ষত আছেন।
বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশে এ হামলায় বৈশ্বিক বাজার ও অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও রিয়াদে হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনের প্রচার চালিয়েছে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
কয়েক দিন আগেও ইরান যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত ছিল না হুথিরা। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল মিত্রকে চাপে ফেলতে গোষ্ঠীটিকে ব্যবহার করছে তেহরান।
২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরব যুদ্ধে নামলে হুথিদের সঙ্গে সংঘাত শুরু হয়। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর পরিবেশ শান্ত ছিল। তবে গত জুলাইয়ে সানা বিমানবন্দরে বিমান অবতরণে সৌদির বাধা দেওয়ার অভিযোগে আবার হামলা শুরু করে হুতিরা।
বর্তমানে সংঘাত ব্যাপক রূপ নিয়েছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথে হুথিদের অগ্রযাত্রা রুখতে ইয়েমেনি বাহিনীকে বিমান সহায়তা দিচ্ছে সৌদি জোট।
হুথিদের দাবি, তারা কেবল সৌদি জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। তবে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে বহু জাহাজে হামলা চালায় তারা, যা পরে মার্কিন বোমাবর্ষণে কমে আসে।
সৌদি আরবের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফুরিয়ে আসছে। ফলে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে তারা। মার্কিন সহায়তা মূলত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ।
শনিবার আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন সৌদির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওমান প্রায়ই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে।
চলতি সপ্তাহে বৈশ্বিক বিমানসংস্থাগুলোকে সতর্ক করে হুথিরা জানায়, সৌদি আকাশসীমা এখন সামরিক এলাকা। এর আগেই এয়ার ইন্ডিয়া, ফ্লাইদুবাই, লুফথানসা ও পিআইএ রিয়াদগামী ফ্লাইট স্থগিত করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি সৌদি আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা বাড়ায়। সংস্থাটি জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে বেসামরিক বিমান ভুল শনাক্তের ঝুঁকি বাড়ছে।
দুই কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবারের হামলায় বিমানবন্দরে তিনটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি জাতীয় এয়ারলাইন্স জানায়, তাদের একটি খালি বিমানে ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ছবি ও তথ্য শেয়ার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সূত্র: এনডিটিভি


