চিকিৎসকদের সুযোগ না দিয়েই মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু

চিকিৎসকদের সুযোগ না দিয়েই মারাত্মক রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কাজ থেকে ছুটি নেন গাজীপুরের কালিয়াকৈরের একটি পোশাক কারখানার নিরাপত্তারক্ষী মেহেদী হাসান। এর কিছুদিন আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার এক সহকর্মী।

মেহেদীকে প্রথমে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে পরীক্ষার পর তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে এবং তাকে ভর্তি নেওয়া হয়। কিন্তু দুই দিনেও শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে গাজীপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ভর্তির সময় তার রক্তের প্লাটিলেট ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার, কিন্তু পরদিনই তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৪ হাজারে। দ্রুত অবস্থার অবনতি হতে থাকায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

ডেঙ্গু রোগীদের শারীরিক অবস্থার এমন দ্রুত অবনতি সামাল দেওয়া চিকিৎসকদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে দেরিতে আসা, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম, শরীরে তরলের মারাত্মক অভাব এবং আইসিইউ শয্যার সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসা নিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে নানা ভুল ধারণাও রয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর রোগের লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা এবং কোনো বিপদের সংকেত দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি। কিন্তু চলতি বছরে অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই স্পষ্ট কোনো পূর্বলক্ষণ না থাকায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭ হাজার ৮২৫ জন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর মূল মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই সংক্রমণ ও মৃত্যু উভয়ই আশঙ্কাজনক জায়গায় পৌঁছেছে। এতে চিকিৎসকদের মধ্যে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

এর আগে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু মৃত্যুর বছর ২০২৩ সালে, প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন। অন্যদিকে ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, হাসপাতালে ভর্তির পরও চিকিৎসকেরা রোগীদের বাঁচানোর জন্য খুব কম সময় পাচ্ছেন।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকির নেতৃত্বে ১১৯টি মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মৃত রোগীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি হাসপাতালে ভর্তির মাত্র এক দিনের মধ্যে মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে, ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমে এবং ১৬ দশমিক ১ শতাংশ রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় মারা গেছেন; আর ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে অন্যান্য কারণে।

চিকিৎসকেরা দেখছেন, অনেকেই জ্বরকে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অবহেলা করে শুরুতে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এমনকি ডেঙ্গু ধরা পড়ার পরও বিপজ্জনক লক্ষণগুলো না চেনার কারণে হাসপাতালে আসতে দেরি করছেন। আর রোগী একবার শকে চলে গেলে চিকিৎসা দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে জ্বরকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা বেশি। ফলে অবস্থা একদম সংকটজনক হওয়ার পরই তারা চিকিৎসার জন্য আসছেন। এছাড়া ঢাকার বাইরের গুরুতর রোগীদের রাজধানীর বড় হাসপাতালে পাঠাতে দেরি হওয়াও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিশেষজ্ঞরা জানান, গত চার বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ‘ডিইএনভি-২’ ধরনটি বেশি দেখা গেলেও চলতি বছরে ‘ডিইএনভি-৩’ ধরনটির প্রকোপ বেশি। ডেঙ্গুর ভিন্ন ভিন্ন ধরনে বারবার আক্রান্ত হওয়া এবং ‘অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট’ (এডিই)-এর কারণে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ১৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এখানকার চিকিৎসকেরা জানান, মৃতদের বেশির ভাগই শক সিন্ড্রোমে মারা গেছেন। দেখা গেছে, কিছু রোগীর রক্তচাপ এবং প্লাটিলেট এত অল্প সময়ে দ্রুত কমে যাচ্ছে যে তাদের অবস্থা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

মিটফোর্ড হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের চিকিৎসক মেহেরুন্নেসা নেহানা টাইমসকে বলেন, গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তনালী থেকে তরল বের হয়ে যেতে পারে, যাকে ‘প্লাজমা লিকেজ’ বলে। এতে রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, রক্তচাপ কমে যায় এবং রোগী শকে চলে যান। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে এই জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে।

একইভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শাহ মো. গালিব আলম জানান, ২০১৭-১৮ মৌসুমের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে তীব্র ডায়রিয়া ও বমির প্রাদুর্ভাব বেশি। ডায়রিয়া-বমি এবং প্লাজমা লিকেজের কারণে দ্রুত শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। এর সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যা থাকলে চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

ডা. গালিব জানান, প্লাটিলেট সংখ্যা নিয়ে রোগী ও তাদের পরিবারের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা চিকিৎসকদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। তিনি স্পষ্ট করেন, কেবল প্লাটিলেট কমলেই রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। রক্ত দেওয়া নির্ভর করে রোগীর শরীরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না, সার্বিক অবস্থা কেমন এবং ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।

খাবারের ব্যাপারেও মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা আছে। ডেঙ্গু রোগীকে প্রচুর ডাবের পানি, পেঁপে, কমলা বা নানা ফল খাওয়ানোর যে প্রথা রয়েছে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ডা. গালিব সতর্ক করে বলেন, এসব খাবার ডেঙ্গু সারায় না। অতিরিক্ত ফল বা ডাবের পানি খেলে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে অথবা পেটে গ্যাস, অস্বস্তি ও ব্যথা হতে পারে।

পেটে তীব্র ব্যথা ডেঙ্গুর একটি অন্যতম বিপদের লক্ষণ। অতিরিক্ত খাওয়ানোর ফলে পেটে অস্বস্তি হলে আসল লক্ষণটি চেনা যায় না এবং চিকিৎসকদের বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

ডা. গালিব আরও বলেন, কোনো রোগী ড্রাগন ফল খাওয়ার পর লাল মল ত্যাগ করলে, সেটা ফলের রঙের জন্য নাকি শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণের কারণে হচ্ছে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ভুল ডায়াগনোসিস হতে পারে এবং রোগী ও স্বজনদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক ছড়ায়।

রক্তচাপ কমে শক বা রক্তক্ষরণ শুরু হলে রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া ও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা জরুরি। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার অভাব থাকায় অনেক দেরি হয়ে যায়। যেমন, মিটফোর্ড হাসপাতালে মাত্র ১০টি আইসিইউ শয্যা আছে, যা সবসময় পূর্ণ থাকে।

চিকিৎসকরা এক মর্মান্তিক ঘটনার কথা জানিয়ে বলেন, এক রোগীর প্লাটিলেট সাময়িকভাবে ১৩ হাজার থেকে বেড়ে ১৪ হাজার ও ২২ হাজার হয়েছিল। কিন্তু পরে আবার কমে ১৫ হাজারে নেমে আসে। দুই দিন ধরে চেষ্টা করেও খালি শয্যা না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি।

সর্বোপরি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, অ্যাজমা, থ্যালাসেমিয়া কিংবা ব্লাড ক্যান্সারের মতো পুরোনো রোগ আছে এমন ডেঙ্গু রোগীদের সামলানো খুবই কঠিন। এদের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে শরীরে লবণের ভারসাম্যহীনতা, রক্তে শর্করার ওঠানামা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, যার জন্য একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার হয়। তবে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা কর্মীর অভাবে রোগীদের এই প্রয়োজনীয় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা এক কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad