ছিনতাই-চাঁদাবাজি মামলার আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বের হয়েই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে-পুলিশের এই অভিযোগ বেশ পুরোনো। ঢাকার আদালতের চিত্র একটু কাছে থেকে দেখলেই এর পেছনের কারণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, কোনো মামলা সংবাদমাধ্যমে খুব বেশি হইচই তৈরি না করলে বা আসামি হাইপ্রোফাইল না হলে, তাকে জেলে রাখার ব্যাপারে সরকারি আইনজীবী ও তদন্তকারীদের তেমন কোনো তোড়জোড় থাকে না। অথচ রাজনীতি সংক্রান্ত মামলাগুলোতে আসামির জামিন আটকাতে রাষ্ট্রপক্ষকে বেশ শক্ত ও সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়।
রাষ্ট্রপক্ষের এই দ্বিমুখী আচরণের কারণে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, চুরি ও মাদকের মতো মামলার আসামিরা মাত্র কয়েকটি শুনানির পরই সহজে জামিনে বেরিয়ে যায়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা (প্রসিকিউটর) সরকার থেকে মাসে নির্দিষ্ট ভাতা পান। রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের পক্ষে লড়াই করে মামলাগুলো সঠিকভাবে শেষ করাই তাদের মূল কাজ। কিন্তু যেসব মামলা নিয়ে আলোচনা কম, সেগুলোতে আদালতে তাদের নামমাত্র উপস্থিতি থাকে।
আদালতের এই চিত্র নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফারুক হোসেন ফারুকী টাইমসকে বলেন, ‘সাধারণত আলোচিত মামলাগুলোতেই রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে থাকে। যেসব মামলা নিয়ে অত আলোচনা নেই, সেগুলোতে উপস্থিতি কম থাকে। এখানে রাজনীতি বা ব্যক্তির পরিচয় কোনো বিষয় নয়। মূলত বিচার শুরু হওয়ার পরই আমাদের আসল কাজ। তার আগে আমরা যা করি, সেটা অতিরিক্ত কাজ।’
গত ২৯ আগস্ট ঢাকায় ছিনতাইকারীদের হাতে বগুড়ার এক শিক্ষক খুন হওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। ওই ঘটনার পর যাদের ধরা হয়েছে, দেখা গেছে তাদের অনেকেই আগেও বারবার গ্রেপ্তার হয়েছিল।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, আদাবর থানায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির মামলায় ধরা পড়া মো. পলাশের বিরুদ্ধে আগেই তিনটি মামলা ছিল। তবুও মাত্র ৫ হাজার টাকার মুচলেকায় সে জামিনে বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আবার শেখেরটেক এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে ধরা পড়া আসামি শফিকের ঘটনাও একই। চুরি, মারামারি, হামলা ও হুমকির অভিযোগে ২০১৫, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর জামিন পেতে তারও কোনো সমস্যা হয়নি।
রাজনীতি সংক্রান্ত মামলাগুলোতে চিত্র আবার একদম উল্টো। সেখানে আসামিকে জেলে রাখতে পুলিশ ও সরকারি আইনজীবী—দুই পক্ষকেই বেশ তৎপর দেখা যায়। এমনকি কোনো মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেও আসামিকে অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে (শোন-অ্যারেস্ট) কারাগারে আটকে রাখা হয়।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহকে সম্প্রতি টানা তিনটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গত ১৪ জুন তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পান। ঢাকার একটি আদালত তাকে ১ লাখ টাকার বন্ড ও পাসপোর্ট জমা দেওয়ার শর্তে জামিননামা দাখিলের অনুমতি দেন। কিন্তু ৩০ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে আবার গ্রেপ্তার দেখানোয় তার মুক্তি আটকে যায়। পরে তিনি সেই মামলাতেও জামিন পান। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর আরেকটি হত্যা মামলায় তাকে আবারও গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এ নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন টাইমসকে বলেন, ‘কলিমুল্লাহ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একটি হত্যা মামলার সঙ্গে তার নাম রয়েছে।’
ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো সাধারণ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ভূমিকা কেন এত ঢিলেঢালা–এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি একজন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি)। শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে কথা বলা আমার নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এটা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, তাই আমি কিছু বলতে পারব না।’
অন্যদিকে পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে জানান, পুলিশ তদন্ত করে আসামি ধরে আদালতে পাঠায়। কিন্তু জামিন দেবেন কি দেবেন না, সেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বিচারকদের।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ আসামিকে ধরে আদালতে পাঠায়। এরপর আদালত জামিন দিলে কোন কারণে দিল, তা পুলিশের জানা থাকে না। আসামিকে আদালতে পাঠানোর পর তার জামিন হবে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের কোনো হাত থাকে না।’
পুরো বিচার ব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতাকেই এই অবস্থার জন্য দায়ী করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন দুর্বল বলেই সরকারি আইনজীবীদের কাজে এমন পার্থক্য দেখা যায়। আইনের শাসন শক্ত হলে তারা রাজনীতি বা গণমাধ্যমের আলোচনা না দেখে অপরাধের ধরন বুঝে দায়িত্ব পালন করতেন।’
আইনজীবীদের কম সম্মানী পাওয়ার বিষয়টিকেও দায়ী করে তিনি বলেন, সরকার থেকে পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা না পাওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাধারণ মামলা নিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে তারা যেখানে আয় বেশি তেমন অন্য কাজ বা ব্যক্তিগত মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
মনজিল মোরসেদ বলেন, পরিস্থিতি বদলাতে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।


