বিএনপির বিরুদ্ধে ‘মোক্ষম সময়ের’ অপেক্ষায় জামায়াত

বিএনপির বিরুদ্ধে ‘মোক্ষম সময়ের’ অপেক্ষায় জামায়াত
কার্টুন/টাইমস
Advertisement
Advertisement

সরকার গঠনের পর বিএনপির সঙ্গে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এগোনোর যে অবস্থান নিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী, তা থেকে সরে আসছে দলটি। আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিনের রাজপথের মিত্র বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার সেই ‘সংসার’ এখন ভাঙনের পথে।

শুরুতে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার কাছাকাছি সময়ের আগে চাপ সৃষ্টিকারী কর্মসূচি বা আন্দোলনে না যাওয়ার পক্ষে ছিল জামায়াত। তবে সেই অবস্থান বদলে এখন কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা ভাবছে দলটি। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

সংস্কার বাস্তবায়নে গড়িমসি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, লোডশেডিং, জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা, দলীয়করণ এবং বিরোধী দলকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাতে চায় জামায়াত। এসব ইস্যুতে রাজপথে জোরালো কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপে রাখার পরিকল্পনা করছে দলটি।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার টাইমসকে বলেন, ‘গণরায় ও বিরোধী দলকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছেমতো সংবিধান সংশোধন করে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা চালুর অপচেষ্টার পরিণতি শিগগিরই ভোগ করবে বিএনপি। দলটির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার চেয়ে দেশের মানুষের চাওয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে জামায়াত।’

দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, সংস্কার বাস্তবায়ন ও বিরোধী দলকে রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার প্রশ্নে সরকার অবস্থান পরিবর্তন না করলে চলমান কর্মসূচির পর আরও কঠোর আন্দোলনে যাবে জামায়াত। তবে এ ক্ষেত্রে হঠকারী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না দলটি।

জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় এক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে জনরোষ তৈরি হয়েছে, আগামী দিনে সেগুলো আরও প্রকট হবে বলে মনে করছে দলটি। সেই অসন্তোষ আরও তীব্র হওয়ার অপেক্ষায় থেকে আন্দোলনের জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নিতে চায় জামায়াত। এ ক্ষেত্রে সরকার কত দিন ক্ষমতায় রয়েছে, সেটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে রাজি নয় জামাত।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই মনোভাব ইতিমধ্যে স্থানীয় পর্যায়েও জানানো হয়েছে। জামাতের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার কয়েকজন আমির টাইমসকে বলেছেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা সরকারের ব্যর্থতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিষয়গুলো সামনে এনে নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজ করছেন।

জামায়াত নেতাদের মূল্যায়ন, সরকার গঠনের পর বিএনপি প্রথমেই হতাশ করেছে জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা ‘জেন জি’ প্রজন্মকে। নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও ক্ষমতায় এসে দলটি তা বাস্তবায়ন না করে উল্টোপথে হাঁটা শুরু করে।

সম্প্রতি ইউনিয়ন পর্যায়ে সারের সরকারি ডিলার নিয়োগ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বদলির জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বাধীন কমিটিতে বিএনপির নেতাদের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

এর আগে সারা দেশে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের জন্য সুপারভাইজার নিয়োগ ঘিরেও ব্যাপক হট্টগোল হয়। নিয়োগ না পেয়ে নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই ইউএনও কার্যালয়ে হামলা চালায়।

সরকার গঠনের পর থেকে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের তুলনায় উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য এবং বিভিন্ন কমিটিতে নাম রাখা হলেও যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ার অভিযোগে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরী হয়।

অন্যদিকে, তেল ও গ্যাসের সংকটের পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতি থাকলেও জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা, অব্যাহত লোডশেডিং এবং বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সার না পাওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি ক্ষোভ বেড়েছে।

সারা দেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনাও অসন্তোষ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার এক বৈঠকে নিজ দলের সংসদ সদস্যদের কড়া বার্তা দিয়েছেন।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গণভোট, বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে পরিবর্তন ও বাতিল করা নিয়েও জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমসকে বলেন, ‘বিএনপি গণরায়কে অস্বীকার করায় আমরা শুরুতেই সংসদে কথা বলেছি। সেখানে সমাধান না হওয়ায় আমরা রাজপথের কর্মসূচিতে রয়েছি। জনগণের অধিকার আদায়ে আমরা সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নামব। তার জন্য বড় ধরনের ঝামেলা তৈরি হলে এর দায় সরকারকে নিতে হবে।’

বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যেই রাজপথে লংমার্চের কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কমানোর দাবিতে সেপ্টেম্বর থেকে বিভাগীয় শহরগুলোতে লংমার্চ শুরু করছে বিরোধী দলীয় জোট।

১১-দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর খুলনায় এবং পরে সিলেটে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর নভেম্বরের শেষ দিকে অথবা ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ওই মহাসমাবেশ থেকে জুলাই সনদ দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিএনপি সরকারকে অল্প সময়ের একটি আলটিমেটাম দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এরপরও দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।

তবে জামায়াতের এই অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করছে বিএনপি।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান টাইমসকে বলেন, ‘শুরু থেকে জামায়াত ফ্যাসিবাদী কায়দায় হাঁটছে। ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশকে এগিয়ে নিতে বিএনপি জাতীয় ঐক্য চাইলেও জামায়াত চাইছে না। যে কারণে সরকার গঠনের পর থেকেই দলটি নানা ইস্যুতে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে।’

বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্রতার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৯৯ সালে জোট গঠনের পর দুই দল দীর্ঘ সময় পাশাপাশি পথ চলেছে। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হয়।

২০২৬ সালের নির্বাচনেও দুই দলের সম্পর্কে প্রকাশ্যে টানাপোড়েন থাকলেও এক ধরনের সমঝোতা ছিল বলে মনে করা হয়। ওই নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বিএনপি জোট সরকার গঠন করে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে।

এরপর থেকেই দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমে বিপরীতমুখী হয়ে উঠছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad