আইন পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ৩৫ বছরের পর আইনজীবী হওয়ার পথ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এজিও–ইউএনডিপি ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের সমাপনী ও ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী এ কথা জানান।
এ সময় আইনমন্ত্রী স্টেজে থাকা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের দিকে তাকালে তিনি এ বিষয়ে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে বলে জানান।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে এর আগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি সুপারিশ করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরদিন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২৫৩/২০১৪ নম্বর সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিলের প্রেক্ষাপটে কমিটি এ বিষয়ে যৌক্তিক সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কমিটির মতামতে বলা হয়, আইন পেশার মর্যাদা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং পেশাকে আরও গতিশীল রাখার লক্ষ্যে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা সমীচীন।
পরে লিগ্যাল এডুকেশন কমিটির প্রস্তাব ও সুপারিশ গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বার কাউন্সিলের সভায় উপস্থাপন করা হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যরা আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের বিষয়ে সবাই একমত হন। গৃহীত সিদ্ধান্ত ২০৩০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২-এর ২৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন পেশায় প্রবেশের ন্যূনতম বয়স ২১ বছর। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা নির্ধারিত থাকলেও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইনজীবীদের অবসরের জন্য অবশ্য কোনো নির্ধারিত বয়সসীমা নেই।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী আইনজীবী পেশার সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের তুলনা করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের শুরুটা তুলনামূলক উজ্জ্বল হলেও আইনজীবীদের পেশাজীবন নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগোয়। প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবসরে যাওয়ার পর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু তখন নতুন করে এ পেশায় এসে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা আইনজীবীদের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
আইনজীবী পেশার সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিসিএস কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তুলনায় বিয়ের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের চাহিদা কম। পেশাটির মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আইনজীবীদের নিজেদেরই ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, একজন আইনজীবীর জ্ঞান শুধু আইনশাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অর্থনীতি, রসায়ন, সামাজিক চুক্তিতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শরীরবিদ্যা সম্পর্কেও ধারণা থাকা প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডের মামলায় শরীরবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান যেমন কাজে লাগে, তেমনি আর্থিক বিরোধের মামলায় অর্থনীতির জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবীদের ‘সামাজিক প্রকৌশলী’ হিসেবে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া ফাটল মেরামতেও তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে অবদান রাখতে হলে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আইনজীবীদের ভালো মানুষও হতে হবে।
বিচারকদের অসদাচরণের জন্য জবাবদিহির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আইনজীবীদেরও জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে। আইনজীবীদের জন্য আচরণবিধি থাকলেও এর প্রয়োগ সীমিত। পেশাগত নৈতিকতা জোরদার করতে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
আইন পেশার ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এআই এ পেশার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সুপ্রিম কোর্টে প্রতিদিন নানা আইনি সমস্যা সমাধানের মধ্য দিয়ে আইনজীবীরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা কাজে লাগিয়ে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।


