হুথি কারা, কী চায় তারা?

হুথি কারা, কী চায় তারা?
সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের প্রতিবাদে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিক্ষোভ করেন আনসার আল্লাহর সমর্থকেরা। ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ওই বিক্ষোভে সংগঠনটির নেতা আবদুল মালিক আল-হুথির প্রতিকৃতি তুলে ধরেন তারা। ছবি: এএফপি/বাসস
Advertisement
Advertisement

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবার তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে চলছে তুমুল লড়াই।

সেপ্টেম্বরে হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ইয়েমেনের একটি অংশ দখল করে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে অবস্থিত এই প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ। হুথিদের এই অগ্রযাত্রার পর তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। এর আগে ছয় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল।

অক্টোবরের শুরুতে সরকারপন্থী বাহিনী জানায়, বড় ধরনের পাল্টা অভিযান এবং সৌদি আরবের তীব্র বিমান হামলার সহায়তায় তারা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নজরদারির সুবিধা দেয় এমন এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।

এসব হামলার জবাবে হুথিরা প্রতিবেশী সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি স্থাপনা ও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে অন্তত ১৩ জন নিহত হন। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।

হুথিরা কারা?

হুথিরা উত্তর ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গোষ্ঠী, যারা দেশটির সংখ্যালঘু জায়দি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘জায়দিবাদ’ শিয়া ইসলামের একটি শাখা।

হুথিরা নিজেদের ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ বলে ঘোষণা করেছে। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই জোটে হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে গোষ্ঠীটির নাম আনসার আল্লাহ, যার অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। ১৯৯০ এর দশকে গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। এর প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন আল-হুথির নাম থেকেই ‘হুথি’ নামটি এসেছে। ২০০৪ সাল থেকে তার ভাই আবদুল মালিক আল-হুথি গোষ্ঠীটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।

২০০০ এর দশকের শুরুর দিকে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহে জড়ায় হুথিরা। উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের মূল এলাকায় আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিল তারা।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় গণঅভ্যুত্থানের মুখে সালেহ তার উপপ্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

প্রেসিডেন্ট হাদির সরকার নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে হুথিরা প্রথমে উত্তরাঞ্চলের সাদা প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে।

২০১৫ সালে তারা পশ্চিম ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করে নেয় এবং হাদিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এরপর সরকারকে সহায়তা করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে।

এরপর থেকে চলা লড়াইয়ে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট। জাতিসংঘের হিসাবে, ইয়েমেনে ২ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষের কোনো না কোনো ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।

হুথিদের সামরিক শক্তিও ক্রমাগত বেড়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, ২০২৪ সাল নাগাদ তারা ৩ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত যোদ্ধা নিয়োগ করেছিল। ইয়েমেনের এক চতুর্থাংশ থেকে এক তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব এলাকায় দেশটির প্রায় তিন চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব কীভাবে জড়িত?

সানা থেকে ইয়েমেনের সরকারকে উৎখাত করার পর সৌদি আরব আশঙ্কা করে, হুথিরা পুরো দেশ দখল করে একে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের প্রভাবাধীন রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।

আরও পড়ুন

সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে সৌদি আরব কয়েকটি আরব দেশকে নিয়ে জোট গঠন করে এবং বিমান হামলা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এ অভিযানে রসদ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়।

তবে বছরের পর বছর বিমান হামলা এবং ইয়েমেনের সামরিক বাহিনী ও হুথিবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর স্থল অভিযানেও দখল করা অধিকাংশ এলাকা থেকে হুথিদের সরানো সম্ভব হয়নি।

২০২২ সালে মধ্যস্থতার মাধ্যমে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে লড়াই অনেকটাই থেমে যায়। ওই বছর হাদি তার ক্ষমতা নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তর করেন। এই কাউন্সিল এডেনভিত্তিক সরকার পরিচালনা করে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পরপরই হুথিরা ইসরায়েল এবং লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে বলে জানায়।

জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। হুথিদের সামরিক সক্ষমতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলি হামলায় হুথিদের স্বঘোষিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ গোষ্ঠীটির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিহত হন।

২০২৫ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলে হামলা বন্ধ রাখে হুথিরা। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তারা আবার হামলা শুরু করে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনা কীভাবে শুরু হলো?

হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে চলা অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি জুলাইয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করে।

হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করে। এরপর সৌদি বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী ট্যাংকার লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বন্দর ও বিমানবন্দরে সৌদি আরবের কথিত ‘অবরোধ’ এবং ওই মাসে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলার জবাবে তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। সানা বিমানবন্দরে হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে তারা।

এরপর সেপ্টেম্বরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে ইয়েমেনের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে লোহিত সাগরের উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বা ৮১ মাইল এলাকা দখল করে নেয় হুথিরা। দখল করা এলাকার মধ্যে রয়েছে বন্দরনগরী মোখা ও পেরিম দ্বীপ, যা মায়ুন নামেও পরিচিত।

এই অগ্রযাত্রার ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ ছাড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো হুমকি তৈরি করা হয়নি বলে দাবি করে তারা।

অক্টোবরে ইয়েমেন সরকার হুথিদের দখলে থাকা সব এলাকা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নতুন অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। এরপর সৌদি আরবের তীব্র বিমান হামলার সহায়তায় বাব আল-মান্দেবের আশপাশের কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ সরকারপন্থী বাহিনী ফিরে পেয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। তবে ওই এলাকায় ভূখণ্ড হারানোর কথা অস্বীকার করেছে হুথিরা।

উত্তেজনা বাড়ার পর ইয়েমেনে স্থল লড়াইয়ে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, নতুন করে ২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

হুথিদের তৎপরতায় বিশ্বে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আবার বেড়েছে। আরব উপদ্বীপের অপর পাশে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে সীমিত হয়ে পড়েছে। এর পর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল গ্যাস স্থাপনায় হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ওই হামলার জন্য ইরান সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করা হয়েছিল।

এই উত্তেজনায় পশ্চিমা শক্তিগুলো আবারও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, হুথিদের ওপর সৌদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে তিনি ‘সিদ্ধান্ত নেবেন’।

এদিকে সেপ্টেম্বরে সৌদি যুদ্ধবিমানকে আকাশে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করতে একটি সামরিক বিমান মোতায়েনের বিষয়ে সম্মত হয় যুক্তরাজ্য। দেশটি জানায়, এ সহায়তা দেওয়া হবে ‘শুধু প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে’।

হুথিদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে কারা?

সৌদি আরব ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভিযোগ, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের সময় জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ইরান হুথিদের কাছে অস্ত্র পাচার করেছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল ২০২৪ সালে জানায়, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি), লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে সরঞ্জাম, সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার ফলে হুথিরা শক্তিশালী সামরিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হুথিদের কাছে অস্ত্র পাঠানোর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে তেহরান তৈরি অস্ত্র পাঠাত। এখন ক্রমবর্ধমান হারে এমন যন্ত্রাংশ পাঠানো হচ্ছে, যেগুলো ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জোড়া লাগিয়ে অস্ত্র তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিও তাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে।

তবে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। দেশটির দাবি, তারা শুধু রাজনৈতিকভাবে হুথিদের সমর্থন দেয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad