ভারতে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড সেবা চালুর জন্য ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংককে লাইসেন্স না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সহযোগী সংগঠন ‘স্বদেশি জাগরণ মঞ্চ’ (এসজেএম)।
দাঙ্গা, সন্ত্রাসবাদসংক্রান্ত অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রয়োজনমতো ইন্টারনেট সেবা সীমিত বা বন্ধ রাখার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে মঙ্গলবার ভারত সরকারের কাছে এই দাবি জানায় সংগঠনটি।
এক বিবৃতিতে এসজেএমের জাতীয় সহসমন্বয়ক অশ্বিনী মহাজন বলেন, সংকটময় মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারের নির্দেশে স্টারলিংকের আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলে সেবা সীমিত বা বন্ধ করা বাস্তবে সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
মহাজন উল্লেখ করেন, ‘বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন ধরনের আইনশৃঙ্খলাজনিত জটিল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দাঙ্গা ও বিক্ষোভের মতো ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে অপব্যবহার করে দেশবিরোধী বক্তব্য ছড়ানো হয়। ফলে শান্তি বজায় রাখতে ইন্টারনেট বন্ধের প্রয়োজন পড়ে।’
বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমে কথিত অনিয়ম ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিরোধীদের চলমান আন্দোলনের মধ্যেই এসজেএমের এই স্পর্শকাতর বিবৃতিটি সামনে এল।
সম্প্রতি অবৈধ আটক ও জনসাধারণের চলাচলে বিধিনিষেধ সংক্রান্ত আবেদনের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিল, আন্দোলনকালে ‘ইন্টারনেট সেবা যেন নির্বিঘ্নে চালু থাকে’।
লেজার প্রযুক্তি ও নজরদারি নিয়ে গভীর উদ্বেগ
স্টারলিংকের স্যাটেলাইটে ব্যবহৃত ‘লেজার সংযোগ’ প্রযুক্তি নিয়েও তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অশ্বিনী মহাজন। এই প্রযুক্তিতে উপগ্রহগুলো ভূপৃষ্ঠের কোনো গ্রাউন্ড স্টেশনে ডেটা পাঠানোর আগেই সরাসরি মহাশূন্যে একে অপরের কাছে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।
এসজেএম জানায়, দেশের অভ্যন্তরীণ ডেটা ট্রাফিক যেন বিদেশি পরিকাঠামোর মাধ্যমে দেশের গেটওয়ে এড়িয়ে না যায়, সে বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। অন্যথায় আইনি নজরদারি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়বে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রচলিত টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের বাইরে গিয়ে যোগাযোগের জন্য শত্রুভাবাপন্ন দেশ, চোরাকারবারি কিংবা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এই স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সংবেদনশীল সীমান্ত ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অননুমোদিত টার্মিনাল উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে এবং তদন্তে স্টারলিংকের সরঞ্জামও বাজেয়াপ্ত করেছে দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। ভূরাজনৈতিক উদাহরণ দিতে গিয়ে ইউক্রেন, রাশিয়া, চীন, ইরান ও তাইওয়ানের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সংগঠনটি।
দেশীয় টেলিযোগাযোগ ও মহাকাশ সক্ষমতার জোর সমর্থন
ভারতের বর্তমান টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসজেএম জানায়, দেশীয় মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক যেমন সাশ্রয়ী, তেমনই প্রয়োজনে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
এ ছাড়া পিএসএলভি, চন্দ্রযানসহ ভারতের আসন্ন গগনযান, নিসার ও চন্দ্রযান ৪ কর্মসূচির প্রসঙ্গ টেনে এসজেএম জোর দিয়ে বলে, ভারত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট দিয়েই ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সাশ্রয়ী সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম।
সংগঠনটির স্পষ্ট দাবি, স্টারলিংক ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার শর্ত শতভাগ পূরণ করতে ব্যর্থ হলে কোনোভাবেই যেন লাইসেন্স না দেওয়া হয়। বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে তারা বলে, নিজ দেশের সুরক্ষার স্বার্থে ভারত বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতেই পারে, যেভাবে অন্য দেশগুলোও ভারতীয় পণ্যের ওপর বাণিজ্য বাধা তৈরি করে থাকে।


