কুবিতে হাসিনার পরিবর্তে ‘সুনীতি-শান্তি’ হল, তারা কারা ছিলেন

কুবিতে হাসিনার পরিবর্তে ‘সুনীতি-শান্তি’ হল, তারা কারা ছিলেন
শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরীর ছবিযুক্ত একটি লিফলেট/ ছবি: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
Advertisement
Advertisement

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) নারী শিক্ষার্থীদের একটি আবাসিক হলের নাম ছিল ‘শেখ হাসিনা হল’। তবে সে বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে হলটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। নতুন নাম হিসেবে তারা প্রস্তাব করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া কুমিল্লার দুই বিপ্লবী নারী সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষের নাম। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে হলটির নতুন নাম হয় ‘সুনীতি-শান্তি হল’।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘শেখ হাসিনা হল’ নাম পরিবর্তন করে ‘সুনীতি-শান্তি হল’ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে ৪ নভেম্বর হলটির আবাসিক শিক্ষার্থীরা নাম পরিবর্তনের দাবিতে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেন। এতে ১৬১ জন শিক্ষার্থী সই করেন। তাদের প্রস্তাব ছিল, হলটির নাম রাখা হোক ‘বিপ্লবী সুনীতি-শান্তি হল’। অবশেষে ২১ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০১তম সিন্ডিকেট সভায় হলটির নাম পরিবর্তন করে ‘সুনীতি-শান্তি হল’ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্প্রতি কুবি ‘সোচ্চারের’ সাবেক সভাপতি নাইমুর রহমানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করা পোস্ট এ হলের নামকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি প্রশ্ন করেন ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই’ দেশের অন্য মহিয়সী নারী কিংবা জুলাই শহীদদের নাম বাদ দিয়ে দুইজন ভারতীয় নাগরিক ‘সুনীতি-শান্তির’ নাম প্রস্তাব করা হয়েছিলো কি-না। এ ছাড়া হলে অবস্থানরত ৪০০ শিক্ষার্থীর স্থানে আবেদনপত্রে কেবল ১৬১ জন শিক্ষার্থীর সই থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তবে‚ এই দুই নেত্রীর নামের পেছনে রয়েছে প্রায় এক শতাব্দী আগের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস। সুনীতি চৌধুরী ও শান্তি ঘোষ ছিলেন তৎকালীন কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। স্কুলে পড়ার সময়ই তারা জড়িয়ে পড়েন ব্রিটিশ শাসনবিরোধী বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। যে বয়সে তাদের পড়াশোনা আর স্কুলের গণ্ডিতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তারা বেছে নিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ।

১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড তাদের প্রভাবিত করে। তাদের সহপাঠী প্রফুল্লনলিনী ব্রহ্মের মাধ্যমে সুনীতি ও শান্তির পরিচয় হয় বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তরের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের। ধীরে ধীরে তারা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৩১ সালে কুমিল্লায় গড়ে ওঠা ছাত্রী সংঘের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তারা। শান্তি ছিলেন সংগঠনটির সম্পাদক এবং সুনীতি ছিলেন দলের ক্যাপ্টেন। সেখানে মেয়েদের শরীরচর্চা, ড্রিল ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

আরও পড়ুন

সে সময় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমন করতে পুলিশি অভিযান ও ধরপাকড় চলছিল। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণসহ বিভিন্ন ঘটনা তরুণদের মধ্যে নতুন করে প্রতিরোধের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। কুমিল্লাতেও আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনা সেই বিপ্লবীদের ক্ষুব্ধ করেছিল। বিপ্লবী সংগঠনের নেতারা ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কুমিল্লার তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস জেফরি বাকল্যান্ড স্টিভেন্সকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় সুনীতি ও শান্তিকে।

স্টিভেন্সের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, বিপ্লবীদের ধরপাকড় ও দমন-পীড়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ ছিল। বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে, তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে আঘাত হানার একটি উপায়। সে সময় সুনীতি ও শান্তির বয়স ছিল মাত্র ১৪ ও ১৫ বছর। সিদ্ধান্তটি তাদের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।

১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। স্কুলের সাতার প্রতিযোগিতার অনুমতি নেওয়ার কথা বলে সুনীতি ও শান্তি যান স্টিভেন্সের বাসভবনে। সঙ্গে ছিল একটি নিমন্ত্রণপত্র এবং চাদরের নিচে লুকানো রিভলভার। স্টিভেন্স চিঠিটি দেখার সময় তারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এরপর দুই কিশোরীকে আটক করা হয়। তাদের এই অভিযান ব্রিটিশ প্রশাসনকে নাড়িয়ে দেয় এবং কুমিল্লার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে ওঠে।

গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৩২ সালে তাদের বিচার শুরু হয়। বয়স কম হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দুজনকেই যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। কারাগারে থাকার সময়ও তারা বিপ্লবী পরিচয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। তাদের এই ঘটনা তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

কারাগার থেকে মুক্তির পর সুনীতি চৌধুরী পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক হন। শান্তি ঘোষও পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। পরে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন। দুজনেই ছিলেন ভারতীয় নাগরিক।

প্রায় এক শতাব্দী পর তাদের নাম ফিরে এসেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রী হলের পরিচয়ে। শিক্ষার্থীদের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে কুমিল্লার ইতিহাসের এই দুই নারীকে নতুন করে স্মরণ করার এবং তাদের নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad