জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে যেভাবে গরু জবাই করা হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো বক্তব্য নেই। অন্যদিকে, যারা জবাই করেছেন, তারাও আইনকে পরোয়া করছেন না।
আইনে ক্ষেত্রবিশেষে জবাইখানার বাইরে পশু জবাইয়ের যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তাতেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতির সুযোগ নেই। অথচ প্রক্টর দাবি করেছেন, উপাচার্য গরু জবাইয়ের জন্য মৌখিকভাবে অনুমতি দিয়েছেন।
পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী, ঈদ ও অন্যান্য ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা সরকার ঘোষিত উৎসব-অনুষ্ঠান ছাড়া জবাইখানার বাইরে পশু জবাই করা যায় না। যেসব ক্ষেত্রে জবাই করা যায়, সেখানেও রয়েছে শর্ত। আইন অনুযায়ী, জবাইয়ের স্থান ও পদ্ধতি এমন হতে হবে যাতে পানি, পানির উৎস, বায়ু কিংবা পরিবেশের অন্য কোনো উপাদান দূষিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে। পশু জবাই ও বর্জ্য অপসারণ করতে হবে বিধি অনুযায়ী।
আইন লঙ্ঘনের দায়ে অনূর্ধ্ব এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
কিন্তু শুক্রবার একদল শিক্ষার্থী পশু জবাই করেছে উপাচার্যের ভবনের পাশে। গরুর রক্ত ও ভুঁড়ির অবশিষ্ট অংশ গণিত বিভাগের পাশে ড্রেনে ফেলা হয়, যা পরিবেশ দূষণের কারণ হতে পারে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভান তাহসীব বলেন, ‘ঘটনাটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। প্রশাসন মৌখিক অনুমতি দিলেও আইন লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
তবে গরু জবাইয়ের আয়োজকদের একজন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশে গরু জবাইয়ের বিষয়ে নিষেধ করে বা নির্দিষ্ট আইন আছে বলে আমার জানা নেই।’
তার দাবি, যেহেতু সরকার অনুমোদিত হাট থেকে পশু কিনে ক্যাম্পাসে জবাই দেওয়া হয়েছে, তাই এটা বৈধ।
‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষেই আজকের আয়োজন হয়েছে,’ বলেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ অক্টোবর। ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা অনার্স শেষ করার উপলক্ষে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন।
আয়োজনের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির থাকায় কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। রান্নার কাজে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগও ওঠে। এ নিয়ে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৪ অক্টোবর জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে ক্যাম্পাসে সব ধরনের পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ১৬ অক্টোবর গরু জবাই করে ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির সমর্থনে ১৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় গরু নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিলও করেন তারা।
শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে গরু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আজম খান টাইমসকে বলেন, ‘প্রথম বিজ্ঞপ্তির পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তারা বিষয়টিকে ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছিলেন। শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গরু জবাইয়ের আয়োজনের অনুমতি মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি বলেন, একটি সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা আয়োজন করতে পারবেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে এবং প্রশাসন পুরো বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবে।
তবে পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১ অনুযায়ী জবাইখানার বাইরে পশু জবাইয়ের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই।
আইনে বলা হয়েছে, জবাইখানার বাইরে পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে রোগমুক্ত পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অথবা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি কর্মকর্তার অনুমোদন বা লাইসেন্স প্রয়োজন।
আইনের বিষয়টি তুলে ধরা হলে প্রক্টর এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।


