ক্রমেই জটিল হচ্ছে চুয়েটের উপাচার্য সংকট, অনিশ্চিত সিন্ডিকেট সভা

ক্রমেই জটিল হচ্ছে চুয়েটের উপাচার্য সংকট, অনিশ্চিত সিন্ডিকেট সভা
১৩ অক্টোবর প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর প্রশাসনের সহায়তায় উদ্ধার হন শেখ শরীফুল আলমসহ ১১ জন। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সার্কিট হাউসে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেছেন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ভার্চ্যুয়ালি সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

তবে সভা আহ্বানের পদ্ধতি নিয়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের প্রশ্ন, উপাচার্যের ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থান এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগ কর্মসূচিতে সংকটের সমাধান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সার্কিট হাউসে ফেরেন নবনিযুক্ত উপাচার্য। এর আগে ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের সহায়তায় তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে বের করে নেওয়া হয়। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

চুয়েটের সিন্ডিকেট সদস্য ও স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন মো. রাশিদুল হাসান জানান, উপাচার্য তাকে ভার্চ্যুয়াল সভার কথা জানিয়েছেন। তবে ছুটিতে থাকায় সভায় যোগ দিতে পারবেন কি না, তা নিশ্চিত নন তিনি।

সিন্ডিকেটের আরেক সদস্য ও তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন কাজী দেলোয়ার হোসাইন জানান, উপাচার্য তাকে বার্তা পাঠিয়ে সভার কথা জানিয়েছেন। তবে বার্তার মাধ্যমে সভা আহ্বান করা নিয়মসম্মত কি না, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। সাধারণত রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে সভার চিঠি পাঠানো হয় বলে জানান তিনি।

সিন্ডিকেট সভা আহ্বানের বিষয়ে উপাচার্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে সভাটি নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এবং সেখান থেকে সংকট নিরসনে কোনো সিদ্ধান্ত আসার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।

ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে মুক্তির দাবি শিক্ষার্থীদের

উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে আর না ফেরার শর্তে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, উপাচার্যকে বের করে নেওয়ার আগে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে শর্তটির কথা জানানো হয়েছিল। তবে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম এ ধরনের কোনো অঙ্গীকার করার কথা অস্বীকার করেছেন।

আরও পড়ুন

১৪ অক্টোবর দেওয়া ভিডিও বার্তায় উপাচার্য জানান, তিনি পদত্যাগ করেননি এবং ক্যাম্পাসে আর না ফেরার কোনো অঙ্গীকারও দেননি। সুস্থ হয়ে দায়িত্ব পালনে ফেরার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। উপাচার্য ক্যাম্পাসে ফেরার চেষ্টা করলে আন্দোলন আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি, সাবেক উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করা।

শিক্ষার্থীদের দাবি ও উপাচার্যের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ থাকায় তার ক্যাম্পাসে ফেরার বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নিয়োগ বহাল থাকা অবস্থায় তিনি দায়িত্ব পালনে ফিরতে চাইলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতিও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অসহযোগে স্থবির শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম

চুয়েটে শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের অসহযোগ কর্মসূচির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় সেমিস্টার পরীক্ষা, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি এবং গবেষণাসংশ্লিষ্ট কাজ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

১২ অক্টোবর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তিনটি সংগঠন যৌথ সভায় সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

সংকট নিরসনে স্পষ্ট সমাধান নেই

সিন্ডিকেট সভা আহ্বানকে চলমান সংকটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সভায় কারা অংশ নেবেন, সভা আহ্বানের পদ্ধতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে এবং সংকট নিরসনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়।

উপাচার্যের ক্যাম্পাসে ফেরার ইচ্ছা, শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসহযোগ কর্মসূচি—এই তিনটি বিষয় সংকট সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ না এলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত চালু করা কঠিন হতে পারে।

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা কবে শুরু হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো সময়সূচি নেই। ফলে চুয়েটের সংকট এখন শুধু উপাচার্যের ক্যাম্পাসে ফেরা নিয়ে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালুর প্রশ্নেও গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad