সাতক্ষীরায় ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লোক জড়ো করে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী যখন এলাকায় প্রকাশ্যে ছিলেন, তখন তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেনি পুলিশ। বর্তমানে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে ফেসবুকে রয়েছেন সরব। তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং তিনি এখনো গর্বিত।
শামীমের মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মামলা হলেও এজাহারের কপি দেওয়া হচ্ছে না সংবাদকর্মীদের। ওসির দাবি, এতে করে আসামি গ্রেপ্তারে সমস্যা হবে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। একদল উন্মত্ত মানুষ জড়ো হয়ে মিছিল করেছে, পরে গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বার থেকে শামীমকে ডেকে এনে পেটানো হয়েছে, দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে ঢুকে পেটানো হয়েছে, তখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেনি।
মামলা হওয়ার আগে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমিনী এলাকাতেই প্রকাশ্যে ছিলেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। পরে পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করলেও তিনি লাপাত্তা হন। তার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে Fh Ameni নামে ফেসবুক আইডিতে সক্রিয় আছেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পর সেখান থেকে নানা ধরনের পোস্ট করছেন। তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই এবং বলছেন তিনি পরোয়া করেন না।
আমিনী দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্থানীয় বেশ কিছু মসজিদে ইমামতি করেছেন। তিনি মোটরসাইকেল চালক সমিতি নামে একটি সংগঠনেরও সভাপতি, যে সমিতির সদস্যরা ভাড়ায় যাত্রী টানেন এলাকায়।
শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল সানা মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ জনকে আসামি করেছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা ৫ নম্বর আসামি মোস্তার হোসেন খাঁন ও ৬ নম্বর আসামি আছাদুল ইসলাম মোল্যাকে গ্রেপ্তার করেছে।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শহীন বলেন, ‘বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।’
মামলার এজাহার চাইলে দিতে রাজি হননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি আসামিদের নামও বলতে রাজি হননি। তার দাবি, গ্রেপ্তারের স্বার্থেই নাম পরিচয় বলছেন না তিনি।
আমিনী আত্মগোপনে গিয়ে যেসব পোস্ট করেছেন, তার একটিতে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাদের মধ্যে থাকব না, যে কোনো সময় আমাকে অ্যারেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন, তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না, যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন।”
নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, শামীম মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় তিনি নানা ধরনের গালাগাল করেন। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি অডিও রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
পরদিন বিকালে ফেসবুক লাইভে এসে শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে এলাকাবাসীকে উসকাতে থাকেন আমিনী। তার দাবি, ওই অডিওতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তিমূলক বক্তব্য আছে।
জলিল জানান, একদল মানুষ শামীমের বাড়ির গেট ভাঙচুর করে। পরে তাকে স্থানীয় এক গ্রাম্য ডাক্তারের চেম্বার থেকে ধরে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে পেটানো হয়। স্থানীয় একজন জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯ এ কল করলে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি করে।
আমিনীর নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় হাসপাতালে গিয়ে শামীমের ওপর হামলা হয়। পরে পুলিশ তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তাকে হত্যার পর আমিনী ফেসবুকে বলেন, ‘প্রতিবেশী বা তার সঙ্গে কেউ কথা বললে ইসলাম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলতেন শামীম। তৌহিদী জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।’
শামীমের দুটি ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ১২ বছর, ছোট ছেলের বয়স ৭ থেকে ৮ মাস।


