হারানো ডাকবাক্স: ফিরতি পথ ধরে প্রেরকের ঠিকানায়

হারানো ডাকবাক্স: ফিরতি পথ ধরে প্রেরকের ঠিকানায়
ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস এবং কাজী আরিফুজ্জামান রোজেল/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

একসময় চিঠির বাক্স ছিল যোগাযোগের নীরব স্পন্দন। দেয়ালে পেরেক দিয়ে আটকানো কিংবা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লাল ধাতব বাক্সের ভেতর দিয়ে আদান-প্রদান হতো ভালোবাসার চিঠি, চাকরির আবেদনপত্র আর দূরদেশে থাকা স্বজনদের খবর।

আজ সেটি বিস্মৃত। মরিচা পড়েছে, রং উঠে গেছে—অবহেলার এক মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঢাকায় চিঠির বাক্সের এই পতন যেন হাতে লেখা চিঠির পতনেরই প্রতিচ্ছবি।

ছবি: টাইমস

একসময় শহরের অলিগলি ও সড়কের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শত শত ডাকবাক্সের মধ্যে এখন কার্যকর আছে হাতে গোনা কয়েকটি। সড়ক সম্প্রসারণের সময় অনেকগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে; অন্যগুলো কেবলই অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হয়ে গেছে।

যেগুলো এখনও টিকে আছে, সেগুলোর মধ্যে বেশ অনেকগুলোর গায়ে নেই চিঠি সংগ্রহের সময়সূচি, নেই ডাক বিভাগের কোনো পরিচয়চিহ্ন–শুধু আছে বিবর্ণ রং আর ক্রমশ জমে ওঠা ধুলোর আস্তরণ।

এই হারানোর কারণগুলোও খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়।

ই-মেইল, মোবাইল ফোন এবং কুরিয়ার সেবা প্রচলিত ডাকব্যবস্থাকে অনেকটাই অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে।

আরও পড়ুন

ছবি: টাইমস

যে চিঠি একসময় পৌঁছাতে কয়েক দিন লেগে যেত, এখন তা কয়েক সেকেন্ডেই পাঠানো সম্ভব।

ব্যবসার ক্ষেত্রে কুরিয়ার সেবা এনে দিয়েছে দ্রুততা ও পার্সেল ট্র্যাক করার সুবিধা; আর ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে হাতে লেখা চিঠির প্রায় পুরো জায়গাটাই জুড়ে নিয়েছে মেসেজিং অ্যাপগুলো।

অন্যদিকে, সীমিত সম্পদ ও ক্রমহ্রাসমান রাজস্বের কারণে ডাক বিভাগও আধুনিকায়নের সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খেয়েছে। তবু চিঠির বাক্স কেবল চিঠি পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম ছিল না।

এটি এমন এক জনসেবার প্রতীক, যেই সেবার নীরব প্রতিশ্রুতি ছিল একজন মানুষের আয়, পরিচয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ যেমনই হোক না কেন, মাত্র একটি ডাকটিকিটের বিনিময়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তার মনের কথা পৌঁছে দেওয়া যাবে।

ছবি: টাইমস

সেই সময়ে শহরের পথঘাটের জীবনেও চিঠির বাক্সের চিরাচরিত উপস্থিতি মানুষের জন্য ছিল খুবই সাধারণ বিষয়। এই বাক্সের ছোট্ট লাল চিহ্নটি শিশুরা চিনত, আর বড়রা সেই চিহ্নের ওপর ভরসা রাখত। তাই, যারা চিঠি লিখে বড় হয়েছে, তাদের কাছে এই চিঠির বাক্সের ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া এক নীরব বেদনার মতো। এ যেন এক টুকরো সময়েরই নীরব শোক।

আর যে প্রজন্ম কখনো চিঠি পোস্ট করেনি, তাদের চোখে এটি হয়তো কেবলই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো লোহার বাক্স, নিছকই রাস্তার একটি পুরোনো স্থাপনা। যেটি এক টুকরো বিবর্ণ নগর-স্মৃতি বয়ে চলেছে।

ছবি: টাইমস

তবু এটির হারিয়ে যাওয়া আমাদের সামনে আরও বড় এক প্রশ্ন রেখে যায়: ঢাকা যখন ক্রমেই দ্রুততর ডিজিটাল জীবনের দিকে ছুটে চলেছে, সেই ছুটে চলার পথে আমরা আর কী কী পেছনে ফেলে যাচ্ছি?

চিঠির বাক্স হয়তো আজ সময়ের কাছে অচল। কিন্তু এটি সবার জন্য উন্মুক্ত যোগাযোগ, অপেক্ষার ধৈর্য, আর মানুষের হাতে মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার এক ব্যক্তিগত ও মানবিক মাধ্যমের মত যে ধরনের ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করত, সেই ভাবনাটি হয়তো বিস্মৃত হওয়ার নয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad