হরমুজে ইরানি কার্গো জাহাজে হামলা, স্থগিত আঞ্চলিক বৈঠক

হরমুজে ইরানি কার্গো জাহাজে হামলা, স্থগিত আঞ্চলিক বৈঠক
ছবি: এপি/ ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হরমুজ প্রণালিতে দেশটির একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান। স্থানীয় সময় রোববারের ওই হামলায় একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন।

দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, কেশমের গভর্নর এই হামলার জন্য একটি ‘সন্ত্রাসী শত্রুকে’ (যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র গোষ্ঠী) দায়ী করেছেন। এর জেরে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনাও স্থগিত করেছে ইরান।

অবশ্য জাহাজে হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে ইরানের বন্দর অবরোধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের পতাকাবাহী জাহাজে হামলা চালিয়েছে। জবাবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান এবং এখনো তারা তেহরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নতুন হুমকির মুখে রয়েছে।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, কেশম দ্বীপটি ইরানের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দ্বীপটি ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠী হুথিদের হামলার শঙ্কায় লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের হুমকি বেড়ে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও আঞ্চলিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা বাব এল-মান্দেব প্রণালির একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ (মায়ুন দ্বীপ) দখল করেছে। এই প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে বিবেচিত।

জাহাজে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ইরান সরকার তাদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানায়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘আমাদের জনগণকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে না। ইরান আত্মসমর্পণ করবে না।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরান “খুব জোরেশোরে একটি চুক্তি করতে চায়” এবং “তারা বারবার ফোন করছে”।’

রোববার আয়ারল্যান্ডের ডুনবেগে নিজের গলফ কোর্সে আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প এসব কথা বলেন।

পরে এক সাংবাদিক জানতে চান, রোববার ভোরে হরমুজ প্রণালিতে ইরানি পণ্যবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এর জবাব দিতে চাই না।’ এরপর তিনি ওয়াশিংটনে ফেরার জন্য এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন।

আরও পড়ুন

ইরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সোমবার ওমানে বৈঠকে বসবেন। তবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রোববার রাতে জানান, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বাক ইরনা-কে বলেন, ‘কিছু আঞ্চলিক দেশের অনুরোধে’ ইরান ও ওমান বৈঠকটি পিছিয়ে দিতে সম্মত হয়েছে।

উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, সৌদি আরব ইরান-ওমান চুক্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিটি হরমুজ প্রণালি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অন্য দেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে- এমন উদ্বেগ থেকে সৌদি আরব এ উদ্যোগ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে হামলা অব্যাহত থাকায় সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে।

যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, রোববার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইলের আঘাত লেগেছে। তবে এটি ইরানের কেশম দ্বীপের কাছে হামলার একই ঘটনা কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সংস্থাটি জানায়, ওই জাহাজে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জাহাজে থাকা লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তাদের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ওমানের উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা দেওয়ার কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এ কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ওমানে বৈঠক স্থগিত হওয়ার আগে কেবল ইরাক প্রকাশ্যে জানিয়েছিল, তারা এতে অংশ নেবে। বাহরাইন জানিয়েছিল, তেহরানের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় তারা বৈঠকে অংশ নেবে না।

যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান জাহাজ চলাচলের জন্য ফি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। দেশটির দাবি, পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা দিয়ে চলাচল করবে। অন্যদিকে, বের হওয়ার পথে জাহাজগুলো আংশিকভাবে ইরান ও আংশিকভাবে ওমানের জলসীমা ব্যবহার করবে।

ওমানে পরিকল্পিত বৈঠক নিয়ে অঞ্চলটিতে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। উপসাগরীয় দেশগুলো আশা করেছিল, যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সরাসরি জড়িত না থাকা সত্ত্বেও তারা একটি যৌথ অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পাবে।

কয়েক মাস ধরে ইরান এসব দেশের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। তেহরানের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ওই দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা।

রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট জানান, তিনি ভারতের নয়াদিল্লিতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সম্মেলনের (ব্রিকস) ফাঁকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে ‘ভালো আলোচনা’ করেছেন। একইসঙ্গে আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানও পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, যাতে অতীতকে পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো যায় এবং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad