বন্যার ক্ষতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি চট্টগ্রামের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত। ফসল, শাকসবজি, মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুর ক্ষতির প্রভাব পড়েছে বাজারে। স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাইরের জেলার পণ্যের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি।
এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই বেতন বৃদ্ধির কারণে চাহিদা ও পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন বেসরকারি চাকরিজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও সাধারণ কর্মজীবীরা।
শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরীর বড় কাঁচাবাজার বহদ্দারহাটে বাজার করতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
কসমোপলিটন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদা বেগম বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোয় তার আপত্তি নেই। তবে এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে পড়লে সব শ্রেণির মানুষকে চাপ সামলাতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়াচ্ছে, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু এর প্রভাব বাজারে পড়লে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে তা বহন করতে হবে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়বেন বেসরকারি কর্মচারী ও সাধারণ কর্মজীবীরা।’
মাসুদ আলম বলেন, বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে না পড়লেও সময়ের সঙ্গে নিত্যপণ্যের দামে এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়েও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বহদ্দারহাটের মুদি দোকানি আমান উল্লাহ বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে ঘোষণা সবেমাত্র এসেছে। এখনো চাল, ডালসহ নিত্যপণ্যের খুচরা বাজারে বড় প্রভাব পড়েনি।
তিনি বলেন, ‘পাইকারিতে দাম বাড়লেই খুচরা বাজারে দাম বাড়বে। সরকার কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করে, সেটিই বড় প্রশ্ন।’
বন্যার ক্ষত এখনো বাজারে
সম্প্রতি ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসল ও সবজির পাশাপাশি মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও খামারিরা এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বাজারকে বাইরের জেলার পণ্যের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে।
তবে বাজারে কিছুটা স্বস্তিও ফিরছে। আতুরার ডিপো কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা ফিরোজ আলম বলেন, বন্যার পর পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। এখন সরবরাহ বাড়ছে। কিছু পণ্যের দাম কমতেও শুরু করেছে। তবে দাম যেভাবে বেড়েছিল, সেভাবে কমছে না।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, কয়েক ধরনের সবজির সরবরাহ বেড়েছে। পটোল, শসা, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙা ও চালকুমড়া কেজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা ও শিম ১৮০ টাকা কেজি।
মাছ-মাংসেও চড়া দাম
সবজির পাশাপাশি মাছের বাজারেও স্বস্তি ফেরেনি। তেলাপিয়া ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৫০, রুই-কাতলা ৩৫০ থেকে ৪০০ ও পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ২৮০, পোয়া ২৬০ থেকে ২৮০, বাইম ৬০০ থেকে ৮০০ ও দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি। চাষের কই প্রায় ৩০০ টাকা ও চাষের শিং আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চিংড়ি আকারভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ইলিশের দামও চড়া। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৯০০ টাকা কেজি, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। এক থেকে দেড় কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা কেজি।
মুরগির বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্রয়লার ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা ও সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজার ও দোকানভেদে দামের পার্থক্য ২০ থেকে ৩০ টাকা।
বাড়ছে চালের দাম
খুচরা ও পাইকারি দুই বাজারেই চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। স্বর্ণা চাল আগে ৫১ থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ৫৬ থেকে ৬০ টাকা। মাঝারি মানের পাইজাম ও বিআর-২৮ চাল ৭০ থেকে ৭২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
নাজিরশাইল ৮২ থেকে ৮৫ টাকা ও মিনিকেট ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা। গুটি ও চায়না ইরি ধরনের মোটা চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি।
স্বস্তির বদলে নতুন শঙ্কা
বন্যার পর সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। কিছু সবজির দামও কমছে। তবে সামগ্রিক বাজার এখনো স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে পড়বে কি না, তা নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বেতন বাড়লেই সব পণ্যের দাম বাড়বে, এমন নয়। উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, পাইকারি দাম ও চাহিদার ওপর খুচরা বাজারের দাম নির্ভর করে। তবে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সরবরাহ না বাড়লে বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
ক্রেতাদের আশঙ্কা, বন্যার কারণে বাড়তি বাজার খরচ এরই মধ্যে সংসারে চাপ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়লে সীমিত আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।
চট্টগ্রামের বাজারে এখন স্থানীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক করা জরুরি। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।
বন্যার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই বাজারে নতুন মূল্যচাপ তৈরি হলে এর বোঝা পুরো ভোক্তা সমাজকেই বহন করতে হবে।


