রাজস্ব খাতে সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ঋণনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, আধুনিক, ক্যাশলেস, কন্টাক্ট-ফ্রি ও ফেসলেস রাজস্ব ব্যবস্থা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি হবে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রাজস্ব সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সভাপতিত্ব করেন। অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর অনলাইনে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এনবিআরের বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের তুলনায় এ লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রাটি উচ্চাভিলাষী হলেও অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানোর বিকল্প নেই।’
তিনি বলেন, ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে হলে নিজেদের উন্নয়নের অর্থায়ন নিজেদের সম্পদ দিয়ে করতে হবে। আধুনিকায়ন, করজাল সম্প্রসারণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।’
রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুরোনো এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থা বিভাগ গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ হবে সরকারের থিংক ট্যাংক। এ বিভাগ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামো প্রণয়ন করবে। রাজস্ব ব্যবস্থা বিভাগ হবে রাজস্ব আদায়ের মূল বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান।’
নীতি প্রণয়নে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষক, শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠন, আইন, হিসাববিজ্ঞান, নিরীক্ষা ও পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। বাজেট ও নীতি প্রণয়নের আগে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের ব্যবস্থাও থাকবে।
রাজস্ব প্রশাসন পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া করদাতাকে কর কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, ই-ভ্যাট, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট ও প্রযুক্তিনির্ভর স্ক্যানিংসহ বিভিন্ন উদ্যোগে করদাতা ও ব্যবসায়ীদের সেবা সহজ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঘরে বা অফিসে বসেই নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিভিত্তিক অডিট চালুর ফলে কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ কমেছে। কর ফাঁকির সুযোগ বন্ধের পাশাপাশি করজাল বিস্তৃত করতে হবে এবং নতুন করদাতা শনাক্ত করতে হবে।’
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি ব্যবসায়ীরা। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবে। তবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তিনি সময়মতো কর ও ভ্যাট পরিশোধের আহ্বান জানান।
প্রশাসনিক জটিলতা ও কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইচ্ছাকৃতভাবে কর পরিহারের সংস্কৃতিতে যারা থাকতে চান, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। সৎ করদাতাকে হয়রানি করা কিংবা অসৎ করদাতাকে অন্যায় সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রাখা যাবে না।’
তিনি বলেন, করদাতার যেমন আইন মেনে কর দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি রাজস্ব কর্মকর্তাদেরও নিরপেক্ষভাবে আইন মেনে সম্মানের সঙ্গে সেবা দেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। রাজস্ব প্রশাসনের কর্মদক্ষতা শুধু কত টাকা আদায় হয়েছে, তা দিয়ে মূল্যায়ন করা যাবে না। করদাতার সন্তুষ্টি ও সেবার মানও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে হবে।
এ জন্য সুস্পষ্ট ট্যাক্সপেয়ার সার্ভিস চার্টার প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কোন সেবা কত দিনে পাওয়া যাবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব কী এবং অভিযোগ কোথায় ও কত সময়ে নিষ্পত্তি হবে, তা স্পষ্ট করার কথা বলেন তিনি।
শিল্পের স্বার্থে দীর্ঘদিনের কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, শিল্পায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কর অব্যাহতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দেশের শিল্প এখন পরিণত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ায় পর্যায়ক্রমে এসব অব্যাহতি কমাতে হবে। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে ও ব্যবসায়ীদের জন্য সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য ব্যবসার পথে বাধা সৃষ্টি করা নয়। স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই লক্ষ্য।’
করদাতাদের হয়রানি কমাতে চলতি বাজেটে কাস্টমস ও ভ্যাট আইনে বিভিন্ন সংস্কার আনা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ দীর্ঘদিন আদালতে ঝুলে থাকা সরকার বা ব্যবসায়ী কারও জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
দীর্ঘমেয়াদি মামলা কমিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগতভাবে রাজস্ব বিরোধ নিষ্পত্তি করাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এনবিআরকে শুধু রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে চলবে না। ব্যবসায়ীদের আর্থিক যাত্রায় এনবিআরকে সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। করদাতারা যেন কর প্রদানকে বোঝা হিসেবে না দেখে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’
তিনি রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রাজস্ব সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সহযোগিতার ওপর। এর মাধ্যমে আধুনিক ও উন্নয়নবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলে নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের উন্নয়নের পথ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।’


