সরকারি নির্মাণ কাজে ক্ষতিকর পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার বন্ধের সময়সীমা পার হয়ে গেলেও এখনো এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেই। এর ফলে কোনো নজরদারি না থাকায় অবৈধ ইটভাটা থেকে প্রতি বছর বাতাসে মিশছে দেড় থেকে দুই কোটি টন কার্বন।
আইনি বাধ্যবাধকতা থাকার পরেও এই নিয়ম কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এর আগে সরকার ঘোষণা দেয়, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মধ্যে রাস্তাঘাট ছাড়া অন্য সব ধরনের সরকারি নির্মাণ কাজে পরিবেশবান্ধব ‘না-পোড়ানো কনক্রিট ব্লক’ ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সনাতন পদ্ধতির ইটই প্রধান নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। দেশজুড়ে সরকারি প্রকল্পগুলো এই নিয়ম কতটা মেনে চলছে, তার কোনো হিসাব বা পরিসংখ্যান কোনো সংস্থার কাছে নেই।
এই ব্যর্থতার কারণে পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই শিল্পের ওপর দেশের নির্ভরশীলতা আরও বেড়েছে। পরিবেশসংক্রান্ত এক জাতীয় কৌশলের তথ্য অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে বৃহত্তর ঢাকার বাতাসে ভেসে থাকা অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণার প্রায় ৯১ শতাংশ এবং তুলনামূলক বড় ধূলিকণার ৮৪ শতাংশেরই উৎস এসব ইটভাটা।
বাতাসে ভেসে থাকা এই অতিসূক্ষ্ম কণাগুলো এতটাই ছোট যে, তা খালি চোখে দেখা যায় না। এগুলো সহজেই মানুষের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট বায়ু দূষণের এক-তৃতীয়াংশ আসে শিল্পকারখানা থেকে, যার বড় একটা অংশের জন্য দায়ী ইটভাটা।
ক্ষমতা গ্রহণের পাঁচ মাস পর, গত ১৮ জুলাই পরিবেশ দূষণ বিষয়ক একটি সভা ডাকেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি ইটভাটার বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সাথে এই শিল্পকে পরিবেশবান্ধব বিকল্প প্রযুক্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, কার্বন ডাই অক্সাইডের সমতুল্য হিসেবে হিসাব করলে দেখা যায় দেশের সামগ্রিক বায়ু দূষণের ২০ শতাংশের বেশি শুধু ইটভাটার কারণে ঘটে।
কার্বন ডাই অক্সাইডের সমতুল্য হলো এমন একটি পদ্ধতি, যা বিভিন্ন দূষণকারী উপাদানের উষ্ণায়ন প্রভাবকে একটি একক মাপে প্রকাশ করে।
পরিবেশের এই ক্ষতি মানুষের স্বাস্থ্য ও দেশের অর্থনীতির ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ছয়টি বড় শহরে এই বায়ু দূষণের কারণে প্রতিদিন গড়ে ২৪২ জন মানুষ অকালে মারা যাচ্ছেন। আর স্বাস্থ্যহানি ও কাজের ক্ষমতা নষ্ট হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর ক্ষতি হয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বা দুই লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা।
এত বড় ক্ষতির পরেও সরকারি ও বেসরকারি সব খাতেই পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার থামানো যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ইটভাটা চাষের জমির ওপরের উর্বর মাটি (টপসয়েল) দিয়ে ইট তৈরি করে, যা কৃষিজমির উর্বরতা ধ্বংস করছে। এছাড়া ইট পোড়ানোর এই প্রক্রিয়া থেকে নির্গত ধোঁয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে মিশে যাচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে তখন সাত হাজার থেকে সাত হাজার ২০০ ইটভাটা ছিল, যা বছরে ২ হাজার ৩০০ কোটি থেকে ৩ হাজার ২৪০ কোটি ইট তৈরি করত।
ঐ বছর এই খাতে প্রায় সাড়ে ৩৬ লাখ টন কয়লা ব্যবহারের পাশাপাশি প্রাকৃতিক গ্যাস, কাঠের গুঁড়ো, আখের ছোবড়া, ধানের তুষ ও জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হয়। সংস্থাটির হিসাবে, প্রতি বছর এই শিল্পে প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা মূল্যের ১৯ লাখ টন কাঠ পোড়ানো হতো।
এই ক্ষতি কমাতে এবং কৃষিজমি রক্ষা করতে সরকার সরকারি কাজে ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নীতি নেয়। ২০১৯ সালে আইন সংশোধন করে এই নীতিকে আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়। বালি, সিমেন্ট ও কয়লার ছাই দিয়ে তৈরি এই ব্লক তৈরিতে কোনো উর্বর মাটির প্রয়োজন হয় না, আবার আগুনে পোড়াতেও হয় না।
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, সরকারি সংস্থাগুলোকে পর্যায়ক্রমে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। লক্ষ্য ছিল, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মধ্যে সরকারি কাজে ব্লকের ব্যবহার ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তৎকালীন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও ঘোষণা দেন, ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি কাজে পোড়ানো ইট পুরোপুরি বন্ধ করা হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সময়সীমা পার হওয়ার এক বছর পরও সরকারি কাজের ঠিক কত শতাংশে ব্লক ব্যবহার করা হয়েছে, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই। ফলে এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার আদৌ কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা, তা খোদ সরকারই জানে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোঃ জিয়াউল হক স্বীকার করেন, ব্লক ব্যবহারের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তিনি জানান, তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হলেও তারা শিগগিরই এই কাজ শুরু করবেন। তবে এখন পরিসংখ্যানের চেয়ে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। উৎপাদন বাড়াতে ব্লক তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কমানো হয়েছে এবং আরও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আইন করার পরও কেন লক্ষ্য পূরণ হলো না—জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত ব্লক না থাকা, বেশি দাম এবং প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অনীহাই এর প্রধান কারণ। সনাতন পদ্ধতির ইট সব জায়গায় পাওয়া গেলেও সব জেলায় ব্লকের কারখানা নেই। এছাড়া ব্লকের স্থায়িত্ব নিয়ে মানুষের মধ্যে কিছু ভুল ধারণাও আছে। চাহিদা কম থাকায় উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়াচ্ছেন না, আবার উৎপাদন কম হওয়ায় চাহিদাও তৈরি হচ্ছে না।
তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাই এই ব্যর্থতার মূল কারণ।
আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, আগের লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা বৈজ্ঞানিক উপায়ে মূল্যায়ন না করেই একের পর এক আমলাতান্ত্রিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সরকার নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই বাস্তবায়ন করতে পারছে না, যা একটি বড় নীতিগত ব্যর্থতা। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনার প্রয়োগ খুবই দুর্বল।
তিনি অনুমান করেন, দেশে বড় জোর ৫ থেকে ১০ শতাংশ সরকারি প্রকল্পে এখন ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এরও কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, বর্তমানে দেশে সাড়ে সাত হাজারের মতো ইটভাটা সচল রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় চার হাজারই অবৈধ। আর গত কয়েক বছরে এই সংখ্যার কোনো পরিবর্তন হয়নি।


