ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় দ্বিতীয় দফায় আরও ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় একনেক সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে হয় ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা।
এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ প্রথম সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন বাড়ছে প্রায় ৫ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে প্রায় ৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাওলা থেকে আব্দুল্লাহপুর, কামারপাড়া, ধউর, আশুলিয়া, জিরাবো, বাইপাইল, ঢাকা ইপিজেড হয়ে সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। এটি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। সরকারের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যানজট কমার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর এবং দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
ডিপিপিতে ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি। প্রথম সংশোধনীর সময় প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছিল ৮৬ টাকা। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়ায় শুধু এই কারণেই প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বেড়েছে।
এ ছাড়া তুরাগ নদীতে নৌযান চলাচল সংক্রান্ত নতুন নির্দেশনার কারণে তিনটি স্থানে সেতুর উচ্চতা ও স্প্যান বাড়াতে হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী অংশে ভবিষ্যতে ছয়টি রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনার কারণে রেললাইন অতিক্রমকারী অংশের নকশাও পরিবর্তন করতে হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলে নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রকল্পে নতুন করে বাইপাইল এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ যুক্ত করা হয়েছে, যাতে নবীনগর ও সাভার দিক থেকে আসা যানবাহন সরাসরি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে পারে। পাশাপাশি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে সরাসরি প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা দিতে কাওলায় নতুন এন্ট্রি ও এক্সিট র্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা মূল প্রকল্পে ছিল না।
এ ছাড়া নকশা পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন সংস্থার বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর, মূল্যস্ফীতিজনিত নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরামর্শক সেবার মেয়াদ বাড়ানোও ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাব অনুযায়ী, শুধু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল নির্মাণ ব্যয়ই প্রায় ৪ হাজার ২৯২ কোটি টাকা বাড়ছে। র্যাম্প নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে আরও ৭৪৮ কোটি টাকা, ইউটিলিটি স্থানান্তরে ৫১৫ কোটি টাকা, মূল্য সমন্বয় বাবদ ৮১০ কোটি টাকা এবং পরামর্শক সেবায় আরও প্রায় ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূল ডিপিপি অনুযায়ী নির্মাণ কাজের কনসালটেন্সির সময়সীমা ছিল ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডসহ (ডিএলপি) মোট ৮৪ মাস। প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় অবশিষ্ট কাজের জন্য পরামর্শক সেবা অব্যাহত রাখতে হবে। এ কারণে দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপিতে পরামর্শক সেবা খাতে অতিরিক্ত ২৫৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে এ খাতে মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৫৫৯ কোটি টাকায়।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকার বেশি। তবে সংশোধিত ব্যয়ের হিসাবে আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।
প্রকল্পটির বিষয়ে মতামত দিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাওলা থেকে সাভারের শ্রীপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হবে।
এতে চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দ্রুত, নিরাপদ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হবে এবং রাজধানীর যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদনযোগ্য বলে কমিশনের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।


