উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জেলা শহর পাবনার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুকুর, দিঘি ও প্রাকৃতিক জলাধার। একসময় এসব জলাধার ছিল সুপেয় পানির প্রধান উৎস, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর মাধ্যম এবং নগরীর সৌন্দর্যের অনন্য নিদর্শন। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ, ভরাট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী এসব জলাধার এখন বিলীনের পথে।
সম্প্রতি সরেজমিনে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে অধিকাংশ জলাধারেরই বেহাল অবস্থা। ডিসি অফিসের পেছনে বাচ্চু স্মৃতি সড়কের পাশে প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো জামতলা জলাধার বা নীলকরদের পরিখা ইতোমধ্যে আংশিক ভরাট ও দখলের শিকার হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট অংশও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের মাধ্যমে সংকুচিত করা হচ্ছে।
দিলালপুর চারতলা মোড় এলাকার হিমসাগর পুকুরে প্রতিদিন লোকালয়ের পয়ঃবর্জ্য ও আবর্জনা পড়ছে। কালাচাঁদ পাড়ার তালতলা পুকুরে আবাসিক এলাকার ড্রেনেজ লাইন সরাসরি সংযুক্ত থাকায় পানির গুণগত মান নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এছাড়া শালগাড়িয়া এলাকার ঝাঁজরা পুকুর কচুরিপানায় আচ্ছাদিত হয়ে মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাধানগর এলাকার মজুমদার পুকুর প্রায় ভরাটের পথে, দীর্ঘদিনের অবহেলায় জেলাপাড়া পুকুর হারিয়েছে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা। একই সাথে যুগিপাড়া মোড়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক সংলগ্ন পুকুরটিও ভরাট প্রক্রিয়ার পথে।
পাবনা পৌরসভার বাসিন্দা ও শিক্ষক পাভেল মৃধা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় শহরে দিনে দিনে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। আগামীতে পানির সংকট আরো বাড়বে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভবিষ্যত প্রজন্ম মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়বে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পৌরবাসীর মতে, এসব জলাধার শুধু পরিবেশ নয়, নগরবাসীর নিরাপদ ভবিষ্যতেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ দুঃখজনকভাবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাছে এসব জলাধারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কিংবা সংরক্ষণের সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই।
পাবনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দুলাল উদ্দিন জানান, পৌরসভার অধীন মোট কতটি জলাধার রয়েছে, সে তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাছে নেই। বিস্তারিত তথ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলীর কাছে রয়েছে বলে তিনি জানালেও পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও সেই উপ-সহকারী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পাবনা পৌর প্রশাসকের কাছেও জলাধারের সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারছি না। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করলে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবো।’
জলাধারসমূহের ভরাট, দখল ও দূষণ রোধে পৌরসভার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
সরকারি অন্যান্য দপ্তরের দায়িত্বশীলদের বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্যের ঘাটতি ও উদাসীনতা প্রকাশ পেয়েছে। পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলি জানান, জলাধারের নির্দিষ্ট তালিকা তাদের কাছেও নেই। তবে অভিযোগ পেলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
অন্যদিকে পাবনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামারা তাসবিহা জানান, উপজেলা পরিষদ চত্বরে দুটি পুকুর থাকলেও সদর উপজেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন বা সদর উপজেলার সব খাস জলাধারের তথ্য ইউএনও কার্যালয়ে নেই। বিস্তারিত জানতে তিনি সদর উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস. এম. ফুয়াদ জানান, উপজেলায় সায়রাতভুক্ত জলমহাল রয়েছে ৩০টি, যার মধ্যে ২০ একরের বেশি আয়তনের জলমহাল ১৯টি। তবে অন্যান্য জলাধারের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা ভূমি অফিসেও নেই।
একইভাবে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীও তাদের অধীন থাকা জলাধারের সংখ্যা জানাতে পারেননি।
এই পরিস্থিতি নিয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব ও ভূ-বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম বলেন, নগর পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর, দিঘি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জলাধারের ভূমিকা অপরিসীম। জলাধার ভরাট ও দূষণের কারণে সুপেয় পানির সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি ভূমি রেকর্ড, স্যাটেলাইট ইমেজ ও আধুনিক জরিপের মাধ্যমে জেলার সব জলাধারের তালিকা প্রণয়ন এবং তা সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৪টি মৌজা ও ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ২৭ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পাবনা পৌরসভায় ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যা ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৩৯ জন। এত বড় নগরীতে জলাধার সংরক্ষণ কেবল পরিবেশগত নয়, জনস্বার্থের জন্যও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু জলাধার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তথ্যের ঘাটতি, সমন্বয়ের অভাব এবং দায়িত্বশীল নজরদারির সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পাবনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হামিদ খান অবিলম্বে পাবনা শহরের সব জলাধারের ডিজিটাল তালিকা প্রস্তুতের দাবি জানান। তিনি বলেন, দখল ও দূষণমুক্ত করতে কঠোর অভিযান, নিয়মিত সংস্কার এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে শহরের শতবর্ষী জলাধারগুলো শুধু ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, জলাধার সংরক্ষণের জন্য দেশে একাধিক আইন বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০), বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ এবং মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০-এ জলাধার ভরাট, শ্রেণি পরিবর্তন ও দখল রোধে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকির অভাবেই পাবনার ঐতিহ্যবাহী জলাধারগুলো দিন দিন মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।


