রামপুরা ব্রিজের নিচ দিয়ে যাতায়াতের জন্য বানানো আন্ডারপারটির কথা এলাকার অনেক মানুষই জানেন না। সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার নজরে আসে ময়লা জমে বন্ধ হয়ে যাওয়া পথটি। এখন নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য উপযুক্ত করা হচ্ছে সেটি।
ডিআইটি রোড ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং রামপুরা ব্রিজ এলাকাটি এই সড়কের একটি অত্যন্ত ব্যস্ততম সংযোগস্থল। প্রতিদিন এই মোড় দিয়ে আফতাবনগর, মহানগর, বনশ্রী ও রামপুরা আবাসিক এলাকার অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করেন। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এই সংযোগস্থলের সঙ্গে যুক্ত।
বনশ্রী ও হাতিরঝিল উভয়মুখী এলাকার অসংখ্য পথচারীকে এই মোড়ে রাস্তা পারাপার হতে হয়। কিন্তু এই ব্যস্ততম রাস্তায় কোনো ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় পথচারীরা প্রতিদিন জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়েই যাতায়াত করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রামপুরা ট্রাফিক জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের তৎপরতায় সামনে আসে স্থাপনাটি। ছয় মাস আগে তিনি এখানে দায়িত্বে আসেন।
হাতিরঝিল প্রকল্প ২০০৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে যখন শুরু হয়, তখন এই আন্ডারপাসটা নির্মাণ হয়। কিন্তু আর ব্যবহার হয়নি। গত ১০ মে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছে সেটি চালুর প্রস্তাব দিয়ে চিঠি পাঠান আনোয়ার হোসেন।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘রাজউককে একাধিকবার চিঠি দিয়ে এই ব্যস্ততম এলাকায় একটি ওভারব্রিজ নির্মাণের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তবে নতুন এমআরটি (মেট্রোরেল) প্রকল্পের কাজের কারণে সেখানে ওভারব্রিজ নির্মাণ করা বর্তমানে সম্ভব নয়।’
এর মধ্যে তার চোখে আগের আন্ডারপাসটি চোখে পড়ে। সেটি ময়লার ভাগাড় ও মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘হাতিরঝিল সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি ও মাদকের আখড়াগুলো উচ্ছেদ করে এলাকাটি সঠিকভাবে পরিচ্ছন্ন ও নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা গেলে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি হবে। তাই পথচারীদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে আমি বিকল্প হিসেবে অতিরিক্ত কমিশনার বরাবরও এই আন্ডারপাসটি ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছি।’
পুলিশের এই প্রস্তাবের পর নড়েচড়ে বসে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক। বৃহস্পতিবার সংস্থাটির একটি বিশেষ দল এলাকাটি পরিদর্শনে আসে। শুক্রবার থেকেই শুরু হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কার কার্যক্রম।
রাজউকের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. আমিনুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘তিনটি ভারী এক্সকাভেটর, ডাম্প ট্রাক এবং পে-লোডার ব্যবহার করে পুরো এলাকায় সাফাই করছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি, শনিবারের মধ্যে পুরো এলাকাটি পরিষ্কার করে ফেলতে পারব।’

পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আন্ডারপাসটি পুরোপুরি চালু করতে আরও কিছু দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। বিশেষ করে, আন্ডারপাসের বিপরীত পাশে থাকা বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জমি ব্যবহার সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে বিটিভি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
রাজউক কর্মকর্তা বলেন, ‘আন্ডারপাস এলাকায় লাইটিং বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন রাজউকের পক্ষ থেকেই করে দেওয়া হবে। আমরা মনে করি, এলাকায় যদি নিয়মিত মানুষের যাতায়াত শুরু হয় এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকে, তবে মাদকসহ নানাবিধ সামাজিক অপরাধের প্রবণতা এমনিতেই অনেক কমে আসবে।’
তিনি জানান, শনিবার সকালেই রাজউক চেয়ারম্যানের এই আন্ডারপাস এলাকাটি পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে।
২০১৬ সালের ২৫শে জুন এই রামপুরা ব্রিজ-সংলগ্ন হাতিরঝিল প্রকল্পের ইউ-লুপটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছিল। যানজট নিরসনে এটি চালু করা হলেও পথচারীদের রাস্তা পারাপারে এটি তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। উল্টো এই সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
প্রায় ২০ বছর ধরে মেরুল বাড্ডা এলাকায় বসবাস করছেন সোহাগ আলম। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন রাস্তা পার হওয়ার সময়ই মনে হয়, এই বুঝি গায়ে উঠায় দিল বাস বা ট্রাক। সেদিনও দেখলাম রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি বাস হঠাৎ ব্রেক করায় পেছন থেকে একটি ট্রাক এসে সজোরে ধাক্কা মারে। এতে বাসের বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হন।’
জানা গেছে, গত বছরের ১৮ আগস্ট রামপুরা ব্রিজের ওপর একটি দ্রুতগামী লরির ধাক্কায় নাজমুল ইসলাম নামের এক মোটরসাইকেল চালক নিহতও হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে আন্ডারপাসটি পথচারী চলাচলের উপযোগী করা হলে হাতিরঝিল, মহানগর, রামপুরা, বনশ্রী ও আফতাবনগরসহ আশেপাশের লক্ষাধিক মানুষের নিরাপদ পারাপার সুগম হবে এবং ডিআইটি মূল সড়কের যান চলাচল আরও গতিশীল হবে।
আন্ডারপাসের পাশে আবর্জনার স্তূপের ওপরই বাঁশ-কাঠের মাচা দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ চায়ের দোকান।
সেখানকার এক চা বিক্রেতা আলম বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই এই রামপুরা ব্রিজের হাতিরঝিল অংশে মাদক বিক্রি শুরু হয়। এভাবে চলতে থাকায় আমরা যারা এখানে থাকি ও কাজ করি, তারা প্রতিনিয়ত চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি।’


