জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় উদ্ভূত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও তার টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিজের বিরুদ্ধে চলমান মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে আবেদন করেছিলেন হাসানুল হক ইনু।
তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি ইনুর এই আবেদনে সাড়া দেয়নি আদালত। প্রসিকিউশনও বিরোধিতা করেছে। শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ইনুর আবেদন খারিজ করে দিয়েছে।
পরে এই মামলায় আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানি অসমাপ্ত থাকা অবস্থায় ৬ এপ্রিল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ টাইমসকে জানান, তারা এই মামলার পুনরায় তদন্ত চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কারণ, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঘটনার মামলাগুলোর তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের সদ্য সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও তার টিমের সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া অন্য কয়েকটি কারণে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই মামলার পুনঃতদন্ত চেয়ে আবেদন করেন ইনু। তবে, আদালত আবেদন খারিজ করেছে।
আসামিপক্ষের দাবি, ইতোপূর্বে মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে ইনুকে নানাভাবে চাপ ও হুমকি প্রদর্শন করেছেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। ট্রাইব্যুনালে বক্তব্য উপস্থাপনে ইনুকে তিনি বাধা দিয়েছেন। এতে পুরো বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে।
যেমন, গত বছরের ২০ জুলাই ইনু ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আদালতের আদেশ ছাড়া এবং তার আইনজীবীকে না জানিয়ে কারাগারে প্রবেশ করে তার কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। তখন তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল আসামি ইনুর বক্তব্য উপস্থাপনের বিরোধিতা করে তাকে বাধা দিয়েছেন।
এরপর অভিযোগ গঠনের সময়ও ইনুকে বক্তব্য দিতে তাজুল ইসলাম বাধা দিয়েছেন বলে আসামিপক্ষের দাবি। সিফাত মাহমুদ উল্লেখ করেন, অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনের শুনানির সময় আদালতে আসামিপক্ষের উপস্থাপিত বক্তব্যকে তাজুল রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে অভিহিত করেন, যা তিনি কোনোভাবেই বলতে পারেন না। তার এ ধরনের বক্তব্য স্বাধীনভাবে আসামিপক্ষের মামলা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টি করেছে। অনরূপ কথা
তিনি ট্রাইব্যুনালের বাইরে গিয়ে মিডিয়ার সামনেও বলেছেন, যা জনগণকে শুধু বিভ্রান্তই করেনি, বরং এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইনুর রাজনৈতিক বিরোধীদের আসামি ও তার আইনজীবীদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
আসামিপক্ষ মনে করে, ইনুর বিরুদ্ধে চলমান মামলায় তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটরের স্বার্থের সংঘাত ছিল। কারণ, তাজুল ইসলাম জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করেন এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যার পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। তার এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে প্রসিকিউটরিয়াল অসদাচরণের সমতুল্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) ফিলিপাইনের দুতার্তের মামলায় প্রসিকিউটর করিম খানের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি অভিযোগ উঠেছিল, সেখানে আইসিসি করিম খানকে মামলা পরিচালনা থেকে বারিত করা হয়।
এ ছাড়া, ইনুর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টির সঙ্গে তাজুল ইসলামের দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে তিনি কখনোই নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেননি, দাবি আইনজীবী সিফাত মাহমুদের।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশে ইনুর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলা এনেছেন তাজুল ইসলাম।
মামলা পুনঃতদন্তের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, এ ধরনের বিধান ক্রিমিনাল জুরিসপ্রুডেন্সে নেই, প্রসিকিউশন চাইতে পারে, কিন্তু আসামিপক্ষ থেকে পুনঃতদন্ত চাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। তারা আদালতের ইনহ্যারেন্ট পাওয়ারের বলে এই আবেদন করেছিলেন; কিন্তু আমরা মনে করি, এটি এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। পরিকল্পিতভাবে বিচার বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে আসামিপক্ষের এ আবেদন আদালত খারিজ করেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। একই সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর পদে পূর্বে নিযুক্ত মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করা হয়। এরপর বিদায়ী চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তোলেন আরেক প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ।
তথ্য পাচার, আচরণবিধি ভঙ্গ করা, নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধরসহ বিভিন্ন অভিযোগে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদকে অপসারণ করতে জানুয়ারিতে আইন উপদেষ্টাকে তাজুলের অনুরোধের বিষয়টি এরই মধ্যে সামনে আসে।
এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড়ের মধ্যেই বিচারাধীন মামলার আসামিকে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অন্য একজন প্রসিকিউর সাইমুম রেজা তালুকদারের ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।
এ ঘটনায় প্রসিকিউশন থেকে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, প্রসিকিউশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা সমালোচনা বিচারকাজকে প্রভাবিত করবে না।


