একসময় তুলনামূলক শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী জেলা এখন রূপ নিয়েছে এক অশান্ত ও আতঙ্কিত অঞ্চলে। সাম্প্রতিক সময়ে জেলাজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ ও অস্ত্রের মহড়া। গত সাত মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত ১৩ টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটানো এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বই এই আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির মূল কারণ।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব চলাকালে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দৃশ্যপট আরও জটিল হয়েছে। সে সময় উপজেলার শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধানরা গা-ঢাকা দিলেও মাঠ ছাড়েনি তাদের সদস্যরা। উল্টো খোলস বদলে, নতুন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়ে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে মাদক ব্যবসা, খুন ও চাঁদাবাজি এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নোয়াখালী সদর, বেগমগঞ্জ, চাটখিল, সেনবাগ ও কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, ছুরিকাঘাত ও গুলির ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাসে জেলায় বিভিন্ন ঘটনায় ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সদর উপজেলার আন্ডারচর ইউনিয়নের নিরব (২৬), দাদপুরের কামাল উদ্দিন (৫০), নোয়ান্নই ইউনিয়নে আব্দুল হাই (৭৫) এবং গৌরীপুরের মোহাম্মদ সেলিম (৫৫)।
বেগমগঞ্জ উপজেলার হাজিপুর গ্রামের ফখরুল ইসলাম মঞ্জু (২৫), খানপুরের জুবায়ের হোসেন রাকিব (২৩) এবং আব্দুল কাদের (৩৫), মোহাম্মদ ফাহিম (২১)। সোনাইমুড়ী উপজেলায় মাদক ব্যবসার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয় একজনকে। এ ছাড়া নাটেশ্বরের ইউনিয়নে ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন কমল (৪৫) এবং ওয়াসপুরের আবু বক্কর সিদ্দিকী (৩৫)। চাটখিল ও কবিরহাট চাটখিল পৌরসভার দৌলতপুরের খোকন (৩২) এবং কবিরহাটের চর গুল্লাখালী ইউনিয়নের আনোয়ার হোসেন (২২)।
সবশেষ গত বুধবার রাতে সেনবাগ উপজেলার নবীপুর গ্রামে নানা বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে মাদকসেবীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় ১৭ বছর বয়সী স্কুলছাত্র আরাফাত হোসেন ফাহিম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন গ্রুপ ও কিশোর গ্যাং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রায়ই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনা, কথাকাটাকাটি কিংবা খেলাধুলার বিরোধও রূপ নিচ্ছে খুনাখুনিত। সন্ধ্যার পর সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন অভিভাবকরা। কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য মহড়া ও মোটরসাইকেল শোডাউন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের আগে বেগমগঞ্জের আটটি ইউনিয়নে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনী গড়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম- আলাইয়ারপুরের বাহিনী, আমানউল্লাহপুরে ধোপা মামুন, একলাশপুরে রাসেল বাহিনী (ক্যাডার দেলোয়ার ও হৃদয়), বাংলাবাজার এলাকায় পিচ্চি রাসেল, চৌমুহনী পৌরসভায় সম্রাট ও খালাসি সুমন বাহিনী, পৌর আওয়ামী লীগের একাংশের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর ও জুয়েল, গোপালপুরে মাসুম, শরিফপুরে সুজন বাহিনী, মিরওয়ারিশপুরে জাকির ও জিরতলীতে মিলন বাহিনী।
এদের প্রায় সবাই সাবেক ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। পটপরিবর্তনের পর কিছু বাহিনীর প্রধান স্বাভাবিক জীবনে ফেরার দাবি করলেও অথবা আত্মগোপনে চলে গেলেও তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা এখন নতুন রাজনৈতিক লেবাস লাগিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেগমগঞ্জের এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে এক নেতার ভয়ে থাকতাম, এখন নতুন নতুন দলের আশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের ভয়ে ঘর থেকে বের হওয়াই দায়।’
এদিকে শরীফপুর ইউনিয়নে দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে জুবায়ের হোসেন রাকিব (২৩) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। হামলায় গুরুতর আহত একজন পরে হাসপাতালে মারা যান। এই জোড়া খুনের পর নিহতদের মরদেহ নিয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
অন্যদিকে গত ৮ জুন গোপালপুর-বাংলাবাজার সড়কের বায়তুন নূর জামে মসজিদের সামনের অস্থায়ী পুলিশ চেকপোস্টে মো. রাহিম (২১) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশ। তার কাছ থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, আট রাউন্ড তাজা গুলি, তিনটি ম্যাগাজিন ও একটি রয়েল এনফিল্ড মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়।
অস্ত্র উদ্ধারের একদিন পর দিনের বেলা প্রকাশ্যে হাজীপুর ইউনিয়নের কালামিয়ার পোল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খালাসী সুমন বাহিনীর সৈকত ও সাদ্দামের নেতৃত্বে ফারুক হোসেন (২৭) নামের এক রাজমিস্ত্রিকে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। তিনি বর্তমানে নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
নোয়াখালী জেলার সিনিয়র আইনজীবী ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এবিএম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দুঃখজনক হারে নোয়াখালীতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনমনে চরম আশঙ্কা তৈরি করেছে। এর জন্য কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা ও প্রশাসনের দুর্বলতাই দায়ী। প্রশাসনের উচিত দ্রুত রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের সাথে বসে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।’
নোয়াখালী জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন খান বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের জন্য মাদক, কিশোর গ্যাং ও আধিপত্য বিস্তার মূলত দায়ী। জুলাই বিপ্লবের পর থেকে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং পুলিশের নিয়মিত অভিযান না থাকায় হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে।’
সচেতন মহলের মতে, পারিবারিক নজরদারির অভাব, বেকারত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে তরুণরা অপরাধে ঝুঁকছে। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; পরিবার, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলার সার্বিক বিষয়ে নোয়াখালী জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি কারা কারা এই গ্রুপে কাজ করছে বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িত, তাদেরও আমরা তালিকা নিচ্ছি এবং এলাকায় বা বাংলাদেশের ভিতরে কেউ আছে কিনা, থাকলে আমরা গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।’
তবে সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের দাবি, শুধু লোকদেখানো বা সাময়িক অভিযান নয়, অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। অবিলম্বে এসব ‘ছদ্মবেশী’ সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা না হলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন জেলার বাসিন্দারা।


