বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দেশজুড়ে সংঘটিত বিভীষিকাময় গুম ও খুনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে মোট ২৮ জনকে চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম।
অভিযুক্তদের তালিকায় উঠে এসেছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার নাম। মূলত, গুম থেকে বেঁচে ফেরা ৪০ জন ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউশন টিমের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে আছেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। প্রসিকিউশনের দাবি, এসব সামরিক কর্মকর্তা র্যাব ও প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থায় (ডিজিএফআই) দায়িত্ব পালনের সময় সেখানে গড়ে তুলেছিলেন একাধিক গোপন বন্দিশালা বা নির্যাতন কেন্দ্র। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য মানুষকে সেখানে বন্দী রেখে নারকীয় নির্যাতন চালানো হয়। তাই, ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাদের বিচার হওয়া অপরিহার্য।
প্রসিকিউশন টিমের সূত্র জানায়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার লক্ষ্যে বিরোধী মতাদর্শ এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার কৌশল নেয়। এর অংশ হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, গুম করে হত্যা, অপহরণ, গোপন স্থানে আটক রেখে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।
ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআইয়ের সদর দপ্তরের পেছনে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি), যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত; এবং রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের পুরাতন অস্ত্রাগার সংলগ্ন দ্বিতল ভবনে টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল নামে গোপন বন্দিশালা ও নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।
গত ৮ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এই অভিযোগপত্রের সমর্থনে প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম গত ৩ ও ৭ ডিসেম্বর আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, বন্দিশালায় আটক ব্যক্তিদের নারকীয় ও পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করা হতো। তাদের ঘড়ির কাঁটার মতো ঘোরানো হতো, উপড়ে ফেলা হতো চোখ। কারও কারও মুখের মাংস খুবলে ফেলা হয়েছে। হাত কেটে ঝুলিয়ে রাখা হতো দেয়ালে, যা অন্যদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্য করা হতো। বন্দিশালার ঘরগুলো ছিল খুবই সংকীর্ণ। সেখানে আটককৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করা হতো এবং বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরিবারগুলো জানত না, তাদের স্বজন বেঁচে আছে না মারা গেছে। গুমের শিকার হয়ে বহু মানুষ আর ফিরে আসেননি।
গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত ২৮ জন
টিএফআই সেলে গুমের ঘটনায় মোট ১৭ জন আসামি। এর মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন, যারা সবাই সেনা কর্মকর্তা। এই তালিকায় আছেন কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল মো. কামরুল হাসান, কর্নেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. সারোয়ার বিন কাশেম, লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল ও লেফটেনেন্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন। পলাতক সাত আসামি হলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. হারুন অর-রশিদ এবং লেফটেনেন্ট কর্নেল মো. খায়রুল ইসলাম।
এ ছাড়া, জেআইসিতে গুমের ঘটনায় মোট ১৩ জন আসামি। এদের মধ্যে শেখ হাসিনা ও তারিক আহমেদ সিদ্দিকীও রয়েছেন। বাকিরা হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ, মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজহার সিদ্দিকী। এদের মধ্যে শেষের তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকী দুটি মামলাতেই আসামি হওয়ায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮।
গুমের ঘটনায় হাসিনার দায়
গুমের ঘটনায় শেখ হাসিনার দায় সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি নিজে কাউকে গুম না করলেও গুমের নির্দেশনা দিয়েছেন। তার জ্ঞাতসারেই গুম করা হয়েছে। অর্থাৎ অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও গুমের নির্দেশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামি শেখ হাসিনা নিজে দেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুমের নির্দেশ দিয়েছেন আসাদুজ্জামান খান কামাল, তারিক সিদ্দিকী বা অন্য আসামিরা। শেখ হাসিনা বিষয়টি জানার পরেও আটক ও গুম বন্ধের নির্দেশ দেননি, এ ধরনের অবৈধ আটক, গুম, খুন ও নির্যাতনে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেননি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার গুম ও খুনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন দুটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে। সেই অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, সরকারি মদদ, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংশ্লিষ্টতায় দেশজুড়ে গুম ও খুন সংঘটিত হয়েছে। এতে আসামিরা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন।
গুমঘর থেকে ফিরে আসা ৪০ জন ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা
অপহরণ ও গুমের হয়েও প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন ৪০ জন। তারা র্যাব ও ডিজিএফআই পরিচালিত বন্দিশালায় আটক ছিলেন। তাদের কাউকে কাউকে একাধিক বন্দিশালায় রাখা হয়।
র্যাবের গুমঘরে নাম না জানা আরও কয়েকজনের সঙ্গে আটক ছিলেন ১৪ জন। তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তির গুমজীবন শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৩ মে এবং শেষ ব্যক্তির গুমজীবনের সমাপ্তি ঘটে গত বছরের ৬ আগস্ট। যেমন- ডা. আশিক উল আকবর ২০১৬ সালের ২৩ মে গুম হন এবং প্রায় দুই মাস পর ২১ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমানকে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট অপহরণ করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ আট বছর পর গত বছরের ৬ আগস্ট উত্তরার টিএফআই সেলে গুম থেকে মুক্ত হন। মাইকেল চাকমা ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল অপহরণ হন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বন্দি ছিলেন। পরদিন তাকে হাত এবং চোখ বেঁধে চট্টগ্রামের এক পাহাড়ি বনে ফেলে যাওয়া হয়।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, র্যাবের ডিজি, এডিজি(অপারেরশন) এবং গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকরা দায়িত্বে যোগদানের সময় এসব বন্দিকে পূর্ববর্তী দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে বুঝে নিতেন। আবার বদলি হওয়ার সময় পরবর্তী দায়িত্বশীলদের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে বা হস্তান্তর করে যেতেন। এর মাধ্যমে গুমঘরে থাকা একজন ব্যক্তির আটক, অপহরণ ও গুমের সঙ্গে আটকের সময় দায়িত্বে থাকা র্যাবের ডিজি, এডিজি (অপারেশন) এবং গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক হিসেবে আসামিরা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে, জেআইসিতে ২৬ জনকে গুম করে রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। তাদেরকে ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে গত বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে গুম রাখা হয়। যেমন, শেখ মো. আবু সালেহ লিটন ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর গুম হন। তাকে ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের বন্দিশালা জেআইসি অর্থাৎ আয়নাঘরে গুম করে রাখা হয়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমীকে ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট বাসা থেকে অপহরণ করে গত বছরের ৬ আগস্ট পর্যন্ত আয়নাঘরে গুম রাখা হয়। এরপর তাকে চোখ হাত বেঁধে টাঙ্গাইলের কাছাকাছি স্থানে ফেলে দেয়া হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট বাসা থেকে অপহরণ করে ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আয়নাঘরে রাখা হয়। পরবর্তীতে তিনিই আয়নাঘরের তথ্য ফাঁস করে দেন।
গুমের এই দুটি অভিযোগ বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।


