পঞ্চগড়ের মহারাজার দিঘী থেকে মানিক হোসেনের (১৯) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করার প্রতিশোধ নিতে আপন বড় বোন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মানিকের আপন বড় বোন সমলা আক্তার (২৪) ও তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় শাহাবুদ্দিন (৪৬)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফরহাদ হোসেন। গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং সমলা আক্তার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গত বুধবার দুপুরে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের মহারাজা দিঘী থেকে মাগুড়া ইউনিয়নের মালাদাম এলাকার বাসিন্দা মানিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে সময় মরদেহের কোমরে একটি চিরকুট পাওয়া যায়, যেখানে মৃত্যুর জন্য কয়েকজন প্রতিবেশীকে দায়ী করা হয়েছিল।
এই ঘটনায় সেদিনই মানিকের বড় ভাই মালেক হোসেন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে পঞ্চগড় সদর থানায় একটি মামলা করেন। বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে পুলিশ তদন্তের অংশ হিসেবে নিহতের বোনের ঘরে তল্লাশি চালায়। সেখানে মানিকের কোমরে পাওয়া চিরকুটের লেখার সঙ্গে হুবহু মিল থাকা একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উদ্ধার করা হয়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মানিকের মা মালেকা বেগম ও বোন সমলাকে আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সমলা হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। ঘটনার সঙ্গে মায়ের কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় পুলিশ তাকে ছেড়ে দেয়।
সমলার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, তার তিনটি বিয়ে হলেও তিনি বাবার বাড়িতে থাকতেন। গত তিন মাস আগে ছোট ভাই মানিক জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে এবং গোপনে সেই দৃশ্য ভিডিও করে রাখে। পরবর্তীতে সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে একাধিকবার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান মানিক।
এই পরিস্থিতির প্রতিশোধ নিতে সমলা পরিকল্পনা শুরু করেন। গত ১২ জুলাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমলার ঝগড়া হলে, তিনি মানিককে হত্যা করে সেই প্রতিবেশীদের ফাঁসানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই পরিকল্পনায় তিনি সহযোগী হিসেবে যুক্ত করেন শাহাবুদ্দিনকে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত সোমবার সন্ধ্যায় সমলা মানিককে নিয়ে মহারাজার দিঘীতে ঘুরতে যান। সেখানেও একটি বাড়িতে মানিক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এরপর রাত ৮টার দিকে পাশের একটি হোটেলে কৌশলে পানির সঙ্গে মানিককে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেন সমলা।
রাত ১০টার দিকে মানিক ঘুমের ঘোরে টলতে শুরু করলে তাকে মহারাজার দিঘীর পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সমলা মানিকের পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করে পানিতে ফেলে দেন এবং কোমরে আগে থেকে লিখে আনা চিরকুটটি গুঁজে দিয়ে সেখান থেকে সরে যান। এরপর তার সহযোগী শাহাবুদ্দিন মানিককে শ্বাসরোধে হত্যা করার পর মরদেহ দিঘীর পানিতে ফেলে দেয়। পরে রাত ১টার দিকে তারা একসঙ্গে বাড়ি ফিরে আসেন। এর দুদিন পর বুধবার দুপুরে দিঘীর পানিতে মানিকের মরদেহ ভেসে ওঠে।


