৬০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও ভেসে যাচ্ছে রেললাইন

৬০০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও ভেসে যাচ্ছে রেললাইন
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রেললাইন মেরামতের জন্য বাংলাদেশ হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে। কিন্তু এই সংস্কার কাজের বেশিরভাগই করা হচ্ছে পুরোনো ধাঁচে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন যেভাবে হুটহাট রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ও বন্যা হচ্ছে, তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো করে রেল নেটওয়ার্ককে গড়ে তোলা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চলমান প্রকল্পগুলো দেখলেই এই অমিল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর টাকায় চলা একটি প্রকল্পে রেললাইন উঁচু করা এবং বন্যা মোকাবিলার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের নিজস্ব তহবিলের বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে রেললাইন উঁচু না করে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত লাইন, মাটির বাঁধ ও ড্রেন মেরামতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

এই তফাতটি দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনার বড় ঘাটতিকে তুলে ধরে। প্রশ্ন উঠছে–দেশ কি রেললাইনকে নতুন জলবায়ুর সঙ্গে মিলিয়ে আধুনিক করছে, নাকি পুরোনো আবহাওয়ার হিসাব ধরে তৈরি হওয়া লাইনের পেছনেই বারবার টাকা ঢালছে?

বর্তমানে তিন হাজার ৪০০ কিলোমিটারের বেশি রেললাইন পরিচালনা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে প্রায় এক হাজার ৯৩১ কিলোমিটার রেললাইন। আর পূর্বাঞ্চলে রেললাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ৩৯১ কিলোমিটার।

এই রেল নেটওয়ার্ক প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী এবং কৃষিপণ্য, কারখানার মালামাল ও আমদানিকৃত পণ্য পরিবহন করে। তাই ঘন ঘন চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সময়ে রেললাইন সুরক্ষিত রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে বন্যায় দেশের অন্তত ৭০ কিলোমিটার রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে লাইনের পাথর ভেসে যাওয়া, মাটির বাঁধ ধসে যাওয়া এবং ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।

তবে এখন আর এই ক্ষতি শুধু চেনা বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

গত ৪ থেকে ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেকর্ড এক হাজার ৪৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। অতিবৃষ্টির ব্যাপক বন্যায় নতুন তৈরি করা চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের বিভিন্ন অংশ পানির নিচে চলে যায়। ফলে প্রায় এক সপ্তাহ ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।

এ ঘটনা নতুন করে রেলওয়ের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ এই লাইনটি একেবারেই নতুন, একে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে এবারের বন্যায় প্রমাণ হয় আবহাওয়া যখন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেয়, তখন নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি লাইনেরও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।

একইভাবে বন্যায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেলপথ, যার মধ্যে রয়েছে ষোলশহর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অংশ।

রেল কর্মকর্তারা জানান, এই লাইনের কিছু জায়গায় অবৈধ দখলের কারণে পানি নামতে পারছে না। আবার কিছু এলাকায় নতুন তৈরি করা ড্রেনগুলো রেললাইনের চেয়েও উঁচু, যার ফলে আটকে থাকা পানি দ্রুত সরতে পারে না।

দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর’, যা রাজধানীর সঙ্গে প্রধান সমুদ্রবন্দরকে যুক্ত করেছে। এই রুটও ২০২০ সাল থেকে কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালীতে বন্যার কারণে বারবার বন্ধ হয়েছে।

অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের মধ্যে রয়েছে পূর্বাঞ্চলের সিলেট-ছাতক রেলপথ এবং পশ্চিমাঞ্চলের জামালপুরের মেলান্দহ, তারাকান্দি ও সরিষাবাড়ী এলাকার রেলপথ।

প্রকৌশলীরা জানান, বন্যার পানি যখন রেললাইনের চেয়ে ৬ ইঞ্চি বা তার বেশি ওপরে উঠে যায়, তখন ট্রেন চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কারণ, এই পানি লাইনের নিচের পাথর ভাসিয়ে নেয়, মাটির বাঁধ নরম করে ফেলে এবং লাইনের ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়, যা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন

এই পরিস্থিতিতে বেশ কিছু বড় সংস্কার প্রকল্প হাতে নিয়েছে রেলওয়ে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনকে মাথায় রাখার ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত।

এডিবির অর্থায়নে প্রায় দুই হাজার ৪১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেটের সিলেট-ছাতক বাজার মিটারগেজ রেলপথ সংস্কারের একটি প্রকল্প চলছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলার স্পষ্ট ব্যবস্থা আছে। এর অধীনে মাটির বাঁধ নতুন করে তৈরি করা, ট্র্যাক সংস্কার, ব্রিজ-কালভার্ট শক্ত করা এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, এই প্রকল্পে ছাতক-সিলেট রেলপথের একটি ৩৪ কিলোমিটার অংশকে প্রায় দুই ফুট উঁচু করা হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আরিফ জানান, বারবার আসা বন্যার ক্ষতি থেকে এই রুটকে বাঁচাতেই লাইন উঁচু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঢিমেতালে চলছে এই প্রকল্পের কাজ। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিপরীতে, সরকারি অর্থায়নে চলা দুটি বড় প্রকল্পে রেললাইন উঁচু করার কোনো পরিকল্পনাই রাখা হয়নি।

পূর্বাঞ্চলের লাইন মেরামত ও সংস্কারের জন্য রেলওয়ের এক হাজার ৭৯১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে। এর মূল কাজ হলো ভেঙে যাওয়া বাঁধ ঠিক করা, দুর্বল লাইন পাল্টানো, ড্রেনের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো শক্ত করা।

পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক তানভিরুল ইসলাম বলেন, মূলত বর্তমান অবকাঠামোকে মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য এই প্রকল্পটি। সামগ্রিকভাবে রেললাইনের উচ্চতা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা এখানে নেই।

একইভাবে, ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্ক মেরামতের জন্য দুই হাজার২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার।

পশ্চিমাঞ্চলের অধীনে রয়েছে প্রায় এক হাজার ৯৩১ কিলোমিটার লাইন, যা বেনাপোল, দর্শনা, রোহনপুর, বিরল ও চিলাহাটির মতো দেশের প্রধান প্রধান স্থলবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম।

পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম নিশ্চিত করেন, এই বড় প্রকল্পেও রেললাইন উঁচু করার কোনো ব্যবস্থা নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আমাদের অবকাঠামো পরিকল্পনার একটি বড় দুর্বলতা। কারণ, বেশিরভাগ রেললাইন তৈরি হয়েছিল অতীতের বৃষ্টি ও বন্যার হিসাব ধরে, যা বর্তমানের আবহাওয়ার সাথে মোটেও মিলছে না।

অতীতে বাংলাদেশের রেললাইনগুলো সাধারণত আশেপাশের মাটি থেকে ২ থেকে ৮ মিটার উঁচুতে তৈরি করা হতো। কিন্তু প্রকৌশলীরা বলছেন, এখনকার বন্যার পানির উচ্চতা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাই পুরোনো বাঁধগুলো আর টিকছে না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক জানান, রেললাইনের উচ্চতা কেমন হবে বা বন্যায় তা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, সে বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও রেলওয়ের মধ্যে অফিশিয়াল কোনো সমন্বয় নেই।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে রেলওয়ের কোনো সমন্বয় নেই। তবে আমরা পরামর্শ দিয়েছি, বন্যার ঝুঁকি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রেললাইন গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অন্তত সাড়ে ৫ মিটার উঁচুতে করা উচিত।’

রেলওয়ের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলোতে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনকে হিসাবে নিতে হবে।

তানভিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের শুধু জরুরি মেরামতের চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যতের রেললাইন অবশ্যই জলবায়ুর পরিবর্তন মাথায় রেখে ডিজাইন করতে হবে।’

পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিশেষ ‘ফ্লাড রিজার্ভ স্টক’ (বন্যার জরুরি মজুত) গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

এর অধীনে নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আগে থেকেই রেললাইন, কংক্রিট স্লিপার, পাথর, ক্লিপ, ব্রিজ-কালভার্টের মালামাল ও সিগন্যাল সরঞ্জাম মজুত রাখা হবে। এতে বন্যা শেষে কেনাকাটার জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত লাইন মেরামত করা যাবে।

কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার সময় কমে আসবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে লাইনের মূল কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না। রেললাইন বারবার বন্যার ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।

রেল চলাচল বন্ধ থাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক বড়। প্রধান রুটগুলো বন্ধ হলে কৃষিপণ্য আসতে দেরি হয়, কলকারখানার মালামাল সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং রাস্তায় গাড়ির চাপ ও যানজট বহুগুণ বেড়ে যায়।

পরিস্থিতি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের এখন শুধু জোড়াতালির মেরামত বন্ধ করা দরকার। এর বদলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে–যেমন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ উঁচু করা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো করা, নদীভাঙন রোধ করা এবং আধুনিক আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন রেললাইন তৈরি করা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad