প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় চরিত্র ‘হিমু’কে ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গল্প লেখার প্রতিযোগিতা আয়োজন করে বিতর্কের মুখে পড়েছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে যুক্ত গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ব্রেইন ল্যাব।
হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের অনুমতি ছাড়া চরিত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে বলে আপত্তি জানান তার ছেলে, চলচ্চিত্র নির্মাতা নুহাশ হুমায়ূন। আইনি পদক্ষেপের সতর্কতার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘এআই হিমু’ সংক্রান্ত মূল ঘোষণা সরিয়ে নেয় ব্রেইন ল্যাব। পরে হিমুর সব উল্লেখ বাদ দিয়ে নতুন নামে একই ধরনের প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়।
রোববার সন্ধ্যার পর ব্রেইন ল্যাবের ফেসবুক পাতায় ‘এআই হিমু’ নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় বাংলা গল্প লেখার একটি প্রতিযোগিতার প্রচারপত্র প্রকাশ করা হয়। সেখানে হলুদ পাঞ্জাবি পরা একটি চরিত্রের ছবিও ব্যবহার করা হয়, যা হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট হিমুর পরিচিত দৃশ্যরূপের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
প্রথম ঘোষণায় দুটি বিভাগে গল্প জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। একটি ছিল ‘হিমুকেন্দ্রিক গল্প’, অন্যটি ‘উন্মুক্ত বিষয়ের গল্প’। অংশগ্রহণকারীরা গল্পের ধারণা ও ভাষাশৈলী তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানানো হয়। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সহলেখক’ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ ছিল। তবে জমা দেওয়ার সময় কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে, তা উল্লেখ করতে বলা হয়।
গল্প জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ৩০ অক্টোবর ২০২৬। যোগাযোগের জন্য একটি ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা এবং ব্রেইন ল্যাবের ওয়েবসাইট দেওয়া হয়। টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে থাকা ছবিতে দেখা যায়, প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টটি শতাধিক শেয়ার করা হয়েছিল।

রোববার মধ্যরাতের কিছু পর বিষয়টি নজরে আসে নুহাশ হুমায়ূনের। নিজের যাচাইকৃত ফেসবুকে প্রতিযোগিতার পোস্টটি ভাগ করে তিনি লেখেন, ‘দেখছি সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই “এআই হিমু” প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে? এটা খুবই হাস্যকর।’
এরপর তিনি জানতে চান, বিষয়টি নিয়ে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
পরে ব্রেইন ল্যাবের মূল পোস্টের নিচেও সরাসরি আপত্তি জানান নুহাশ। তিনি লেখেন, হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারীদের অনুমতি ছাড়া হিমু চরিত্রকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা ‘নিন্দনীয়’। পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেন, অন্যথায় পরিবার আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে নুহাশ এই উদ্যোগে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, হিমু চরিত্র ব্যবহারের জন্য হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। ঘোষণা প্রত্যাহার করা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মূল প্রতিযোগিতার ঘোষণা সরিয়ে নেয় ব্রেইন ল্যাব। তাদের ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত বার্তায় বলা হয়, ‘এআই সহযোগে গল্প লেখা প্রতিযোগিতা এবং এ-সংক্রান্ত প্রকাশিত পোস্টটি বিশেষ কারণে বাতিল করা হলো।’ তবে ‘বিশেষ কারণ’ কী, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

প্রতিযোগিতার প্রচারপত্রে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করে টাইমস অব বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে ব্রেইন ল্যাবের বক্তব্য জানতে চাইলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
তবে প্রতিযোগিতাটি পুরোপুরি বাতিল হয়নি। ২১ সেপ্টেম্বরই ‘হিমু’ বাদ দিয়ে নতুনভাবে প্রতিযোগিতার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর নতুন নাম রাখা হয় ‘এআই দিয়ে বাংলা গল্প’। নতুন প্রচারপত্রে ‘হিমুকেন্দ্রিক গল্প’ বিভাগ এবং হিমুর সঙ্গে সম্পর্কিত দৃশ্যরূপ আর রাখা হয়নি।
নতুন নিয়মে যেকোনো বিষয়ে গল্প জমা দেওয়া যাবে। গল্পের ধারণা ও ভাষাশৈলী তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুযোগ আগের মতোই রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সহলেখক হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া যাবে। গল্পের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ শব্দ। নির্বাচিত লেখকদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা গল্প নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে। জমা দেওয়ার শেষ তারিখও আগের মতো ৩০ অক্টোবর রাখা হয়েছে।
ব্রেইন ল্যাব নিজেদের ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের গবেষণা ও পরীক্ষামূলক শাখা হিসেবে পরিচয় দেয়। প্রকল্পটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের উদ্যোগ।
হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ানো এবং প্রচলিত সামাজিক নিয়মের বাইরে জীবনযাপনের জন্য হিমু কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কাছে হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে পরিচিত চরিত্রগুলোর একটি।
ব্রেইন ল্যাবের নতুন ঘোষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় গল্প লেখার মূল ধারণাটি রয়ে গেছে। বদলেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেখানে আর হিমু নেই।


