বছরের পর বছর আমানতকারীদের কয়েক হাজার কোটি টাকা আটকে রাখার পর পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) বন্ধ বা অবসায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে আগামী ৯ জুন বিশেষ পর্ষদ সভা ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জাতীয় বাজেট ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ সভায় অবসায়নের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ, আমানত ফেরতের কাঠামো এবং প্রয়োজনীয় বাজেট সহায়তার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পর্ষদ অনুমোদন দিলে প্রস্তাবটি দ্রুত অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বাধীন পর্ষদে অর্থ বিভাগের সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান সদস্য হিসেবে রয়েছেন। ফলে ৯ জুনের সভাকে অবসায়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত ১২ মে অনুষ্ঠিত পর্ষদ সভায় প্রথম ধাপে পাঁচটি এনবিএফআই অবসায়নের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রস্তুত করে। এতে আমানত ফেরতের অগ্রাধিকার, অর্থের উৎস, অর্থ বিতরণের পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য সরকারি সহায়তার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অবসায়নের জন্য চিহ্নিত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো ফার্স্ট এশিয়া সিকিউরিটিজ (এফএএস) ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার এমন অবনতি হয়েছে যে প্রচলিত পুনরুদ্ধার বা পুনর্গঠন উদ্যোগে সেগুলোকে সচল করা সম্ভব নয়। ফলে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় অবসায়নই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গত পর্ষদ সভায় পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবসায়নের শর্তাবলি ও একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রস্তুতের করেছে। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রথম পর্যায়ে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। অর্থের প্রাপ্যতা ও সম্পদ বিক্রির অগ্রগতির ভিত্তিতে পরবর্তী পর্যায়ে বড় আমানতকারীদের বিষয় বিবেচনা করা হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী গ্রাহকদের মূল আমানত ফেরত দেওয়া হবে।
শুরুতে ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখান থেকে ৩টি প্রতিষ্ঠান সময় চাইলে ৬টি অবসায়নের জন্য আগানো হয়। সেখান থেকেও প্রিমিয়ার লিজিং সময় চাইলে সর্বশেষ ৫টি অবসায়ন করা হচ্ছে প্রথম ধাপে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দুর্বল নয়টি এনবিএফআইয়ে প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা আমানত আটকে রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টকা ব্যক্তি আমানতকারীদের এবং ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় হাজারো গ্রাহক আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, অবসায়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৯০ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশের মধ্যে এবং তাদের নেট সম্পদ মূল্য নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। ফলে আমানতকারী ও ঋণদাতাদের পাওনা পরিশোধের পর সাধারণ শেয়ারধারীদের জন্য প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনা নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ৯ জুনের পর্ষদ সভা শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দেশের আর্থিক খাতে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ এনবিএফআই রেজল্যুশন কাঠামোর বাস্তব প্রয়োগের পথও উন্মুক্ত করবে। পর্ষদ অনুমোদন পেলে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই অবসায়ন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে।


