হাসপাতালে মৃত্যুপথযাত্রীদের সঙ্গী হবে পোষা প্রাণী

হাসপাতালে মৃত্যুপথযাত্রীদের সঙ্গী হবে পোষা প্রাণী
হসপিসে ইভা লুতকা-ক্রাভচিকের সাথে থেরাপি কুকুর ক্লুস্কা। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

পোষা প্রাণীর প্রতি এক ক্যানসার রোগীর ভালোবাসা পোল্যান্ডে হসপিস (অনিরাময়যোগ্য রোগীদের যত্নের বিশেষ ওয়ার্ড) ও উপশমমূলক চিকিৎসা ওয়ার্ডে পোষা প্রাণীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগকে নতুন গতি দিয়েছে।

পিত্তথলির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর ইভা লুতকা-ক্রাভচিকের প্রথম চিন্তা ছিল নিজের পোষা কুকুর গাইয়াকে নিয়ে। তিন বছর আগে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে গাইয়াকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। চিকিৎসকের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, যেন অন্তত আরও কয়েক বছর বেঁচে থাকতে পারেন, যাতে তার প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত গাইয়া একা হয়ে না পড়ে।

কিন্তু চিকিৎসকদের পূর্বাভাস আশাব্যঞ্জক ছিল না। চলতি মাসে ৭০ বছর বয়সী লুতকা-ক্রাভচিককে ওয়ারশর একটি হাসপাতালের উপশমমূলক চিকিৎসা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। এদিকে স্বামীর কাছে বাড়িতে থাকা গাইয়া প্রায় খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে, পেটের সঙ্গে তরল নিষ্কাশনের নল লাগানো অবস্থায় লুতকা-ক্রাভচিক বলেন, ‘সে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।’

পোল্যান্ডে প্রস্তাবিত নতুন আইনে লুতকা-ক্রাভচিকের মতো রোগীরা হসপিস ও উপশমমূলক চিকিৎসা ওয়ার্ডে নিজেদের পোষা প্রাণীর সাথে সাক্ষাতের আইনি অধিকার পাবেন। বর্তমানে অনেক ক্লিনিকে এমন সাক্ষাতের অনুমতি থাকলেও এ বিষয়ে সর্বজনীন কোনো আইনি অধিকার নেই।

ওয়ারশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপশমমূলক চিকিৎসা ক্লিনিকের পরিচালক চিকিৎসক তোমাশ জিয়েরঝানোভস্কি এ প্রস্তাবের প্রধান উদ্যোক্তা। তার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্কের রাজনৈতিক দলের এক সংসদ সদস্য বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছেন।

জিয়েরঝানোভস্কির মতে, প্রিয় পোষা প্রাণীর উপস্থিতি মৃত্যুপথযাত্রী রোগীদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট অনেকটাই লাঘব করতে পারে। সমাজে তিনি “নিঃসঙ্গতার মহামারি” দেখতে পাচ্ছেন, তাই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘কেউ যখন কষ্টে থাকে, তখন তার পাশে কারও থাকা জরুরি। আদর্শভাবে সেই মানুষটি আরেকজন মানুষ হওয়া উচিত। কিন্তু অনেক সময় কেউ থাকে না।’

আরও পড়ুন

জিয়েরঝানোভস্কি জানান, তিনি প্রায়ই এমন বয়স্ক রোগীদের দেখেন, যারা তাদের বন্ধুদের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে থাকায় একাকী হয়ে পড়েছেন। আবার অনেক তরুণ রোগীও উপশমমূলক চিকিৎসা কেন্দ্রে নিঃসঙ্গ বোধ করেন, কারণ ভার্চ্যুয়াল বন্ধুত্বের এই যুগে তারা আগের প্রজন্মের মতো গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি।

তার এই উদ্যোগের পেছনে প্রেরণা ছিলেন ভালদেমার নামের এক গুরুতর ক্যানসার রোগী। নিজের জীবন নিয়ে তিনি যতটা না উদ্বিগ্ন ছিলেন, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন নিজের দুটি বিড়ালকে নিয়ে। জিয়েরঝানোভস্কি ব্যবস্থা করে বিড়াল দুটিকে ওয়ার্ডে নিয়ে আসেন।

রোগীর আনন্দাশ্রু, বিড়ালগুলোর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া এবং সেই পুনর্মিলনের দৃশ্য অন্যান্য রোগী ও হাসপাতালকর্মীদের অনুভূতি তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই মুহূর্তে জিয়েরঝানোভস্কি উপলব্ধি করেন, বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জিয়েরঝানোভস্কি তার ক্লিনিকে পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে রোগীদের কাছে পোষা প্রাণী নিয়ে আসার অনুমতি দেন। ফলে লুতকা-ক্রাভচিকও গাইয়ার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন। বিষয়টি জানতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত হন।

আইন প্রস্তাব উত্থাপনকারী সংসদ সদস্য কাটাঝিনা পিয়েকারস্কা বলেন, ‘বাস্তবে হাসপাতালগুলোতে প্রাণীরা আগে থেকেই আসছে। তাই বিষয়টি আইনের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।’

জিয়েরঝানোভস্কি থেরাপি-সহায়ক কুকুরদেরও ক্লিনিকে প্রবেশের অনুমতি দেন। ক্লুস্কা নামের একটি অস্ট্রেলীয় শেপার্ড প্রজাতির কুকুরকে তার মালিক মাউগোজাতা বঝোজোভস্কার সঙ্গে রোগীদের কাছে যেতে দেখা যায়।

কুকুরটি লুতকা-ক্রাভচিকের কাছে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও তাকে অসুস্থতার কষ্ট থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে সাহায্য করে। তিনি কুকুরটির থাবা ধরে হাসিমুখে সময় কাটান।

৫৮ বছর বয়সী টিউমারে আক্রান্ত রোগী ভয়চেখ জেলিক উঠে বসে কুকুরটিকে দেখতে থাকেন। বঝোজোভস্কা ক্লুস্কাকে বিভিন্ন কৌশল দেখাতে বললে তিনি মুগ্ধ হয়ে তা উপভোগ করেন।

বঝোজোভস্কা জানান, থেরাপি-সহায়ক কুকুরের উপস্থিতি শুধু রোগীদের নয়, নার্স ও অন্যান্য হাসপাতালকর্মীদের মানসিক চাপও কমায়। ক্লিনিকের অনেক কর্মীকেই করিডরে ক্লুস্কাকে আদর করতে দেখা যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রী বঝোজোভস্কার মতে, রোগীরা নিজেদের পোষা প্রাণীর সঙ্গে দেখা করতে পারলে সুফল আরও বেশি হয়। এতে রোগী, তাদের স্বজন এবং প্রাণীগুলো—সবাই মানসিকভাবে শান্তি পায়।

 

সূত্র: এপি

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad