বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হস্তক্ষেপ কামনা করেছে গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স (জিসিডিজি)। সংস্থাটির দাবি, হামের প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে হাজারের বেশি শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়ে চলছে।
বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে জিসিডিজি এ হস্তক্ষেপ কামনা করে। চিঠিতে জিসিডিজি বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির সক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জিসিডিজির সভাপতি মো. হাবিবি মিল্লাত স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, দ্রুত এবং উচ্চমানের টিকাদান কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান রোগপ্রতিরোধ ঘাটতি পূরণ না করা হলে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগের সংক্রমণ অব্যাহত থাকবে।
চিঠি অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক শিশু আক্রান্ত হওয়ার ফলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হাম সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আক্রান্তদের অধিকাংশই এমন শিশু, যারা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আসেনি অথবা হাম প্রতিরোধী টিকার মাত্র একটি ডোজ পেয়েছে।
আবেদনে উল্লেখিত মহামারি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রিপোর্টকৃত মোট হাম রোগীর ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু মোট আক্রান্তের ৬৬ শতাংশ। এ ছাড়া নয় মাসের কম বয়সী শিশু—যারা নিয়মিত টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছেনি, তাদের সংখ্যা মোট আক্রান্তের ৩৩ শতাংশ।
জিসিডিজি’র মতে, গত দুই বছরে স্বাস্থ্য প্রশাসন, টিকা সংগ্রহ এবং মাঠপর্যায়ে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যর্থতার কারণে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সাত মাসব্যাপী ধর্মঘটের কারণে নিয়মিত টিকাদান ও স্থানীয় রোগ নজরদারি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই স্বাস্থ্যকর্মীরাই সাধারণত বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা এবং টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করেন।
এ ছাড়া ২০২৪–২০২৫ সালে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকার ঘাটতি দেখা দেওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে ইউনিসেফ বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে সতর্ক করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাম প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেয়নি।
জিসিডিজি আরও দাবি করেছে, কর্তৃপক্ষ প্রচলিত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, অভিজ্ঞ টিকাদান বিশেষজ্ঞদের পাশ কাটিয়েছে এবং ২০২৪ সালে নির্ধারিত জাতীয় পরিপূরক টিকাদান অভিযান বিলম্বিত করেছে।এর ফলে বস্তিবাসী ও দুর্গম এলাকার জনগোষ্ঠীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিটি শিশুর টিকাদানযোগ্য রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে জিসিডিজি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য সংস্থা, শিশু অধিকারবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে, যার প্রথম ধাপ হবে প্রাদুর্ভাবের কারণ এবং প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা।
এ ছাড়া, বাংলাদেশকে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম পুনরুদ্ধার, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত ও টিকাদানে সহায়তা করার জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
জিসিডিজি দেশের জনস্বাস্থ্য প্রশাসনে আরও স্বচ্ছতা ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে, আরও প্রাণহানি রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অবিলম্বে বৈশ্বিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো এ চিঠির বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
চিঠির উপসংহারে অধ্যাপক মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশের জনগণের জানার অধিকার রয়েছে যে কী ঘটেছিল। প্রয়োজনে কারা দায়ী তার জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে আরও শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।


