প্রতিষ্ঠার ১৪ বছর পর প্রথমবারের মতো রংপুর সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, মাস্টাররোল, দৈনিক মজুরি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ও দীর্ঘদিন বেতন না বাড়ার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন-ভাতায় কাজ করে আসছিলেন। এতদিন বেতন বৃদ্ধি না হওয়ায় নতুন প্রশাসন বিষয়টি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়।
গত বছরের ১৯ আগস্ট রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন যুগ্ম সচিব মোহা. আশরাফুল ইসলাম। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সিটির কার্যক্রমে গতি আনা এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেন। এজন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মাসিক সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে জানুয়ারি থেকে বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মধ্যে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন-ভাতা পাওয়া কর্মীদের ৩০ শতাংশ, ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া কর্মীদের ২৭ শতাংশ এবং ৩ হাজার ৫০০ টাকার বেশি পাওয়া কর্মীদের ২৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
মাস্টাররোল ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পাওয়া কর্মীদের ৪০ শতাংশ, ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার নিচে পাওয়া কর্মীদের ৩৫ শতাংশ, ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার নিচে পাওয়া কর্মীদের ৩০ শতাংশ এবং ২০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া কর্মীদের ২৫ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে ৪০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া কর্মীদের ৪০ শতাংশ, ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাওয়া কর্মীদের ৩৫ শতাংশ এবং ৫০১ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকা পাওয়া কর্মীদের ৩০ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে মোট ১ হাজার ৬৪৩ জন অস্থায়ী কর্মীর জন্য জানুয়ারি মাসে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। ওই মাসে ১৪৫ জন মাস্টাররোল কর্মী, ৬৪৯ জন দৈনিক মজুরি ও চুক্তিভিত্তিক কর্মী এবং ৮৪৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে মোট ১ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৫৫২ টাকা দেওয়া হয়। আগের বছরের ডিসেম্বর মাসে এই ব্যয় ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ২৩ হাজার ৫৪৩ টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারিতে অতিরিক্ত ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৯ টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে।
বেতন বৃদ্ধি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। যান্ত্রিক শাখার পরিচ্ছন্নতাকর্মী আনজুমান আরা বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে একই বেতনে কাজ করেছেন। নতুন প্রশাসক বেতন বাড়ানোয় এখন বাজারদরের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্য রাখা সম্ভব হবে এবং কাজে আরও মনোযোগ দেওয়া যাবে।’
দৈনিক হাজিরাভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার গাড়িচালক আয়নাল হোসেন জানান, তার বেতন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এতে মাসে ৪ হাজার টাকার বেশি বাড়তি পাচ্ছেন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই বৃদ্ধি তার জন্য বড় স্বস্তি।
সিটি গেটম্যান বাপ্পিমিয়া জানান, আগে যে বেতন পেতেন তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে উপকার হয়েছে বলে তিনি জানান।
মাস্টাররোলে কর্মরত সাধারণ শাখার কর্মী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘চাকরি জীবনে এই প্রথম বেতন-ভাতা বাড়ল। এতে সবাই খুশি।’
চুক্তিভিত্তিক উপসহকারী প্রকৌশলী এনামুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসকের এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।’ এতে কর্মীদের কাজের গতি ও স্বচ্ছতা বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রশাসক মোহা. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্মীদের বেতন কাঠামো দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হন। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এত কম বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়েছে।’
তিনি জানান, গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায় প্রতি বছরই আয়ের পরিমাণ ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকে। এরপর সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো চালু করা হয়।
তার মতে, এতে সিটি করপোরেশনের ব্যয় কিছুটা বাড়লেও কর্মীদের কাজের গতি ও জবাবদিহি বাড়বে। ইতোমধ্যে কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ৬০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।


