হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ৯৭ শতাংশ টিকা পায়নি। তাদের অনেকের টিকা নেওয়ার বয়সও হয়নি। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বাশিই) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। তাদের মধ্যে ১৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকা নেওয়ার বয়স হলেও টিকা না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। দুই গ্রুপেই হাম শনাক্তের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ।
এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৯২ শতাংশ। দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। হার ৭৬ শতাংশ।
গবেষকেরা বলেছেন, দুই ডোজ টিকা নেওয়া ৭৬ শতাংশ শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষণাটি সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর হয়নি। হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে এটি পরিচালিত হয়েছে। তাই ফলাফল আরও গবেষণার দাবি রাখে।
গবেষকদের মতে, টিকা নেওয়ার পর পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়া, অ্যান্টিবডির সুরক্ষা কমে যাওয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোন কারণ কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা গবেষণায় নির্ধারণ করা হয়নি।
গবেষণায় শনাক্ত সব হাম ভাইরাস বি৩ সাবক্লেডের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শনাক্ত বি৩ ভাইরাসের সঙ্গে এসব ভাইরাসের মিল রয়েছে। ভাইরাসের এইচ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে এমন এপিটোপ অঞ্চলে চারটি মিউটেশনও পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের মে মাস থেকে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি করা হচ্ছে। গবেষণা এখনো চলমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া শিশুদের ৮২ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যাপ্ত বা পূর্ণাঙ্গ বুকের দুধ পায়নি। আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল।
আক্রান্ত শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স ছিল তিন থেকে নয় মাস। মোট আক্রান্ত শিশুদের ৩৮ শতাংশ প্রথম ছয় মাস পূর্ণাঙ্গ বুকের দুধ পায়নি। মৃত্যুর ক্ষেত্রে এ হার ৮২ শতাংশ।
অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের ১২ শতাংশ তীব্র ও ৫৩ শতাংশ মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভুগছিল।
হাম ঠেকাতে টিকার বিকল্প নেই
দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে আরও দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহেই হাম বন্ধ হয়ে যাবে, এমন আশ্বাস আমি কাউকে দেব না। কোনো দায়িত্বশীল চিকিৎসক বা বিজ্ঞানীও এমন আশ্বাস দেবেন না।’
হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাদুর্ভাব শুরু হলে এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। শিশুদের সুরক্ষায় চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে। টিকার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ‘ইমিউনাইজেশন ব্যবস্থার গ্যাপ থেকেই এই প্রাদুর্ভাবের সৃষ্টি। এখন টিকার কভারেজ বাড়াতে হবে। চূড়ান্ত সমাধান হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা।’
বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে সময়মতো টিকা না আনা ও ২০২৪ সালের টিকাদান কর্মসূচি যথাসময়ে না করাসহ একাধিক কারণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাঠকর্মী থাকার কথা ৪০ হাজার। বর্তমানে আছেন ২৫ হাজার। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ জনবল কম। এরপরও তাঁরা গ্রাম-গঞ্জ ও চরাঞ্চলে সাইকেল ও নৌকায় টিকা পৌঁছে দিয়েছেন। এক মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।’
ভবিষ্যতের মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস এখন বিশ্বস্বাস্থ্যের বড় অগ্রাধিকার। সব দেশকেই স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।’
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্তদের উন্নত চিকিৎসা ও মৃত্যুহার কমানোর কাজ চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের সমস্যা একদিনে বা এক সপ্তাহে সমাধান হবে, এমন অবাস্তব প্রত্যাশা রাখা যাবে না।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম ও আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী।


