জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুল বলে জানিয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, দেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই ও নিবন্ধনের কাজ যথাযথভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান বজায় রেখে পরিচালিত হয়েছে।
প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের দেওয়া ৮ দশমিক ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা নিয়ে মিয়ানমারের নতুন করে আপত্তি ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ইউএনএইচসিআর এই বিবৃতি এল।
মিয়ানমার সম্প্রতি জানায়, তারা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জন রোহিঙ্গার নামের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রাক্তন বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত হলেও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় তারা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এদিকে, বাংলাদেশ মিয়ানমারের এই অবস্থানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাদের যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এ বিষয়ে দ্য টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের কমিউনিকেশন অফিসার শারি নিজম্যান জানান, ২০১৮ সাল থেকে ইউএনএইচসিআর এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিবন্ধন ও যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানোর পর প্রতিটি রোহিঙ্গাকে একটি করে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, যা মিয়ানমার থেকে আনা নথিপত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে শিবিরে সরেজমিনে উপস্থিতির মাধ্যমে এই পরিচয়গুলো নিয়মিতভাবে আরও নিশ্চিত ও হালনাগাদ করা হয়েছে।
নিজম্যানের মতে, জন্ম, নতুন আগমন এবং অন্যান্য জনসংখ্যার পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করে এই ডেটাবেজ সার্বক্ষণিক হালনাগাদ রাখা হয়। ফলে তথ্যগুলো থাকে অত্যন্ত সঠিক এবং সময়োপযোগী।
তিনি আরও জানান, এই নিবন্ধন ব্যবস্থার ফলেই ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক মানবিক গোষ্ঠীগুলো তাদের সুরক্ষা, সহায়তা, মৌলিক সেবা এবং পরিচয়পত্র সরবরাহ করতে সক্ষম হচ্ছে।
সার্বক্ষণিক আপডেট করা হচ্ছে ডেটাবেজ
নিবন্ধন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ করা যায়। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখা গেছে, সাতটি নিবন্ধন কেন্দ্র সার্বক্ষণিক চালু রয়েছে এবং সক্রিয়ভাবে শরণার্থী তথ্য আপডেট করছে। এর বাইরে ভাষানচরে আরও একটি সক্রিয় নিবন্ধন কেন্দ্র রয়েছে।
শিবিরে নতুন শিশুর জন্ম, মৃত্যু, পরিবারের গঠন পরিবর্তন কিংবা নতুন করে রোহিঙ্গা আগমন সংক্রান্ত সকল তথ্য সার্বক্ষণিক এই কেন্দ্রগুলোতে আপডেট করা হয়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কক্সবাজারে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনসংখ্যাকে তাদের আগমনের সময় অনুসারে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম বিভাগে রয়েছে ১৯৯০ সালের অনুপ্রবেশে আসা ৮ হাজার ৭২১ পরিবারের ৩৯ হাজার ৮৫৬ জন রোহিঙ্গা। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় বিভাগটি ২০১৭ সালের বিশাল অনুপ্রবেশের, যাতে রয়েছে ২ লাখ ১ হাজার ২১৪ পরিবারের ১০ লাখ ৭ হাজার ৪৮৮ জন শরণার্থী, যাদের সরকারিভাবে ‘বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক’ (এফডিএমএন) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
তৃতীয় বিভাগে রয়েছে ২০২৩ সালের পর আগত ৪০ হাজার ৬৪৬ পরিবারের ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন নতুন শরণার্থী, যাদের মধ্যে ৭ হাজার ৫০৪ পরিবারের ৩৩ হাজার ৬৫৯ জন রোহিঙ্গা বর্তমানে ভাসানচরে বসবাস করছেন।
পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্ট, কক্সবাজারের এই ডেটাবেজটি স্থির নয়, বরং ২০১৮ সালের মূল কার্যক্রমের পর থেকেও নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত ও হালনাগাদ হচ্ছে।
নিবন্ধন কোনো এককালীন প্রক্রিয়া নয়
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক যাচাই-বাছাইয়ের প্রেক্ষাপটে এই আপডেট কেন্দ্রগুলোর ধারাবাহিক কার্যক্রম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশি কর্মকর্তা ও ইউএনএইচসিআর সূত্রের মতে, বাংলাদেশের শরণার্থী তথ্য প্রতিনিয়ত আপডেট হওয়ার কারণে ২০১৮ সালে প্রথম যৌথ নিবন্ধন শুরু হওয়ার সময়ের জনসংখ্যারস সঙ্গে বর্তমান শিবিরের জনসংখ্যা হুবহু মিলবে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম, মৃত্যু, পরিবারের সদস্য সংখ্যায় পরিবর্তন ও নতুন আগমনকারীদের সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, এটি ২০১৮ সালের মূল নিবন্ধন ডেটাবেজ এবং বর্তমানের সার্বক্ষণিক আপডেট হওয়া ডেটাবেজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করে।
এটি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: মিয়ানমার যদি বাংলাদেশের জমা দেওয়া কোনো পুরনো তালিকা যাচাই করে, তবে পরবর্তীতে নিবন্ধিত হওয়া ব্যক্তিরা—যেমন বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৮ সালের পর আসা রোহিঙ্গারা–কীভাবে মূল্যায়িত হবে?
১২ লাখ রোহিঙ্গা ও একটি ক্রমবর্ধমান দ্বিতীয় প্রজন্ম
বাংলাদেশ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে, যা একটি সাময়িক জরুরি পরিস্থিতি থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বের বৃহত্তম ও দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান রোহিঙ্গা জনসংখ্যা কেবল ২০১৭ সালের গণহত্যা ও সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরের প্রবৃদ্ধি, পরিবারের বিকাশ এবং নতুন অনুপ্রবেশের কারণে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বিশাল দ্বিতীয় প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি রাখাইনে নতুন করে সহিংসতার জেরে আরও অনেক মানুষ স্থানচ্যুত হয়ে যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কের বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, রোহিঙ্গা সংকটটি ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মগত বাস্তুচ্যুতি সংকটে পরিণত হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রত্যাবাসন চ্যালেঞ্জ এখন আর কেবল রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন মিয়ানমার কীভাবে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সেইসব শিশুদের যাচাই ও স্বীকৃতি দেবে—যাদের বাবা-মা মিয়ানমারের নিবন্ধিত শরণার্থী, কিংবা ২০১৮ সালের পর যারা এসেছেন–সেটিও নির্ধারণ করা বড় চ্যালেঞ্জ।
মিয়ানমারের দাবি প্রত্যাখ্যান করল ইউসিআর
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী নির্বাচিত সংস্থা ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর) মিয়ানমারের সাম্প্রতিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ও দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এটিকে বিভ্রান্তিকর এবং মূল সংকট থেকে দায় এড়ানোর একটি প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছে।
ইউসিআর প্রেসিডিয়াম প্যানেলের সদস্য সায়েদ আলম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, মিয়ানমার মূলত বহু রোহিঙ্গার পরিচয় অস্বীকার করছে এবং নানা শর্ত আরোপ করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে।
রোহিঙ্গারা রাখাইন রাজ্যের মূল অধিবাসী উল্লেখ করে সায়েদ আলম বলেন, যেকোনো প্রত্যাবাসন চুক্তিতে অবশ্যই নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, কেড়ে নেওয়া জমি ও সম্পত্তি ফেরত এবং অন্যান্য মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
ইউসিআর মিয়ানমারের যাচাই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে আরও জানায়, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার পরিচয় অস্বীকার করা টেকসই ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের পথে নতুন বাধা তৈরি করবে।
পরবর্তী প্রজন্মকে কে যাচাই করবে
এই নতুন বিতর্ক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মূল একটি মৌলিক জটিলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে একটি বায়োমেট্রিক ও সার্বক্ষণিক আপডেট হওয়া শরণার্থী ডেটাবেজ রক্ষণাবেক্ষণ করছে, যেখানে মিয়ানমার নিজস্ব নীতিমালায় পুরোনো তথ্য দিয়ে যাচাই করছে তারা কাকে রাখাইনের অধিবাসী হিসেবে স্বীকার করবে।
দুই পক্ষ যদি রেকর্ড এবং যাচাইয়ের মানদণ্ড সমন্বয়ের জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থায় সম্মত না হয়, তবে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সমাধানের দিকে না গিয়ে কেবল অসীম প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে থাকবে।
আর ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করায়, সময় গড়াচ্ছের সাথে সাথে তৈরি হচ্ছে নতুন ডেমোগ্রাফিক বাস্তবায়ন। প্রত্যাবাসন যত পিছিয়ে যাবে, বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা প্রজন্মের আকার তত বড় হবে–এবং কে, কোন অধিকার নিয়ে স্বদেশে ফিরতে পারবে তা নির্ধারণ করা ততটাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।


