নিবন্ধন ছাড়া কোনো কিন্ডারগার্টেন বা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করা যাবে না। নিবন্ধনের সুযোগ সহজ করার পরও কেউ তা না মানলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বুধবার বিকাল ৪টায় চট্টগ্রামের পিটিআইয়ের কনফারেন্স রুমে ‘বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি পরিবর্তন প্রত্যাশা’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালা শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম এবং সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক শিক্ষা চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. নুরুল ইসলাম।
নিবন্ধন ছাড়া স্কুল নয়
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আইনিভাবে সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি তদারকির আওতায় থাকার কথা থাকলেও এত দিন কিন্ডারগার্টেনসহ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল না। এখন এই ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ছাড়া কোনো কিন্ডারগার্টেন বা প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ চলছে, যাতে নিয়ম মেনে যারা বিদ্যালয় পরিচালনা করতে চান, তাদের কোনো অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়।
ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে চাই, স্কুল খোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে চাই না।’ তবে নিবন্ধনের সহজ সুযোগ দেওয়ার পরও কেউ তা না নিলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
নতুন মনিটরিং নীতিমালায় বিদ্যালয়ের আয়তন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। ছোট পরিসরে বিদ্যালয় পরিচালনা করলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাও সে অনুযায়ী সীমিত রাখতে হবে।
বিদ্যালয় তদারকিতে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল থাকলেও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টর ও পিটিআই ইন্সট্রাক্টরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে শূন্যতা রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। আইনি জটিলতার কারণে কিছু নিয়োগ ও পদায়ন আটকে থাকলেও শিগগির এসব পদ পূরণের কাজ শেষ করা হবে। এতে বিদ্যালয়গুলোর মনিটরিং আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ
দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ ছিল। আদালতের রায়ের পর সেই জটিলতা কেটে গেছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৩২ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ফলে সহকারী শিক্ষকদের যেসব পদ শূন্য হবে, সেসব পদে নতুন করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি ১৪ হাজারের বেশি সহকারী শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।
২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে ছয় হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। রায় পাওয়া গেলে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর ১৪ থেকে ১৫ হাজার নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
চাকরির বয়স নয়, মূল্যায়ন হবে গুরুত্বপূর্ণ
প্রাথমিক শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বেতন স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও উচ্চতর গ্রেডের দাবির বিষয়েও নতুন নীতিমালা করা হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তবে শুধু চাকরির মেয়াদের ভিত্তিতে শিক্ষকদের পদোন্নতি বা স্কেল উন্নয়ন করা হবে না। নিয়মিত মূল্যায়নের (অ্যাসেসমেন্ট) ভিত্তিতে এসব বিষয় নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে। নতুন শিক্ষক নীতিমালায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
১০ মাসের প্রশিক্ষণ কমে দুই মাস
শিক্ষকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণেও বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (ন্যাপ) ইতোমধ্যে নতুন প্রশিক্ষণ নীতিমালা নিয়ে কাজ শুরু করেছে।
বর্তমানে পিটিআইগুলোতে শিক্ষকদের ১০ মাসের ইন-ক্যাম্পাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ প্রশিক্ষণ কমিয়ে দুই মাস করার চেষ্টা চলছে। বাকি প্রশিক্ষণ হবে ‘অন দ্য জব’ বা কর্মস্থলে কাজের পাশাপাশি।
এর ফলে কম সময়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
খেলার মাধ্যমে শেখানো হবে
প্রাথমিকের পরিমার্জিত কারিকুলামে ‘অ্যাকটিভ লার্নিং’ বা সক্রিয়ভাবে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খেলা ও গল্পের মাধ্যমে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয় শেখানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ জন্য স্কুল ক্যালেন্ডারেও পরিবর্তন আনা হবে। এক শিফট ও দুই শিফটের বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনা থাকবে। প্রতিদিন ন্যূনতম কত ঘণ্টা পাঠদান হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হবে।
পাঠদানের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণেও কাজ চলছে। এর ফলে একদিকে শিক্ষকেরা নির্ধারিত সময়ের কম পড়াতে পারবেন না, অন্যদিকে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপও দেওয়া যাবে না।
বড় মাঠ নয়, শিশুদের জন্য প্লেগ্রাউন্ড
প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি এবং কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের জন্য বড় খেলার মাঠের চেয়ে ছোট পরিসরের শিশু উপযোগী প্লেগ্রাউন্ড বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যালয়ের আয়তন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে প্লেগ্রাউন্ড বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেখানে কী ধরনের খেলার ব্যবস্থা থাকবে এবং এর আকার কেমন হবে, তা কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করবেন।
শূন্যপদ পূরণ করে বাড়বে মনিটরিং
বিদ্যালয় তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ইউপিটিসি ইন্সট্রাক্টর ও পিটিআই ইন্সট্রাক্টরের মতো পদে অনেক শূন্যতা রয়েছে। এসব পদে দ্রুত পদায়নের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এসব পদ পূরণ করা গেলে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকরভাবে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
ওয়াশরুম, স্বাস্থ্যবিধিতেও নজর
বিদ্যালয়কে শিশুদের জন্য নিরাপদ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে কর্মশালায়। এর অংশ হিসেবে বিদ্যালয়ের ওয়াশরুমের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের মনিটরিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের বদলি প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও কাজ চলছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন শিক্ষক নীতিমালায় বদলির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও বদলির পাশাপাশি বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পাঠদানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সমন্বিত পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।


