টাইমস অব বাংলাদেশে গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত ‘উড়োজাহাজ কেনার আড়ালে স্কাই এয়ারের ১০ মিলিয়ন ডলার পাচার’ শীর্ষক সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংক। ২৩ অক্টোবর পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, সংবাদটি ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’।
তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংকের দাবির ন্যূনতম কোনো মিল নেই।
ট্রাস্ট ব্যাংকের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ‘কিছু অসাধু স্বার্থান্বেষী মহল ট্রাস্ট ব্যাংকের উন্নয়নের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় ঈর্ষান্বিত হয়ে স্বপ্রণোদিতভাবে ট্রাস্ট ব্যাংকের সুমান ক্ষুণ্ন করার অভিপ্রায়ে মিথ্যা বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও কল্পনাপ্রসূত সংবাদ প্রকাশ করে ব্যাংকের মানহানি ও জনসম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত রয়েছে।’
কিন্তু সাংবাদিকতার সকল নীতিমালা অনুসরণ করে, নানা ধরনের নথি যাচাই এবং তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেই এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইমস অব বাংলাদেশ। কোনো মহলের স্বার্থে হাসিলের উদ্দেশ্যে এই সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন করেনি।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, ‘স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্স লিমিটেড ২০১৩ সালে ট্রাস্ট ব্যাংকের নিকট ঋণ সুবিধার আবেদন করে যেখানে হংইউয়ান টেক্সম্যাচ ইন্ডাস্ট্রিয়াল (হংকং) কো. লিমিটেডের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির কপি সংযুক্ত ছিল। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো প্রকার চুক্তির ব্যাপারে ব্যাংকের জানার সুযোগ ছিল না এবং ঋণপত্র সংক্রান্তে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক নীতিমালা ইউসিপি-৬০০ এর ধারা-৪ অনুসারে এর কোনো প্রয়োজনীয়তা বা বাধ্যবাধকতা নেই।’
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বিদ্যমান আইন ও বিধিমিলা বলছে, চুক্তির কপি সংযুক্ত থাকলেও সঠিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে কি না এবং অতিরিক্ত দাম দেখানো হয়েছে কি না–এগুলো অবশ্যই ট্রাস্ট ব্যাংকের যাচাই করে নিতে হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা টাইমসকে স্পষ্ট করেছেন, বিমান আমদানি করতে যখন একটি টেক্সটাইল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিপত্র ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে, তখন অবশ্যই ব্যাংকটির দায়িত্ব ছিল এই বিষয়ে সতর্ক হওয়া।
২০০৯ সালের ৩১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘গাইডলাইস ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন’-এর সেকশন ১১ সহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রজ্ঞাপনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঘোষিত আমদানি পণ্যের বাজারমূল্য যাচাই করে নেওয়ার জন্য। এ ছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে নেওয়ারও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সঠিকভাবে আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে নিলেই ব্যাংকের কাছে স্পষ্ট হতো, হংইউয়ান টেক্সম্যাচ আসলে কোন কোন ব্যবসায় জড়িত।
পাশাপাশি প্রতিবাদলিপিতে ‘ইউসিপি-৬০০’-এর কথা উল্লেখ করে ট্রাস্ট ব্যাংক দায়মুক্তি নিতে চাইলেও এটি কোনো দেশের জন্য বাধ্যতামূলক আইন নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক বিধিমালা, যা কোনো দেশ চাইলে অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক লেনদেন নিজস্ব আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনের কথা উল্লেখ না করে আন্তর্জাতিক বিধিমালার রেফারেন্স টেনে ব্যাংকটি মূলত কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।
ট্রাস্ট ব্যাংক তাদের প্রতিবাদলিপিতে লিখেছে, ‘স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্স লিমিটেড যে দুটি কার্গো বিমান বিদেশ হতে ক্রয় করে, এর দুটিই ছিল পুরাতন ও রিফারবিশড। আর এই পুরাতন কার্গো বিমানের মূল্য যাচাইয়ের কোনো সর্বজনীন নির্দিষ্ট ও স্বীকৃত মানদণ্ড নেই বিধায় ইন্টারনেট হতে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে মূল্য সম্পর্কে আমাদের ধারনা নিতে হয়। এর পাশাপাশি রপ্তানিকারকের ক্রেডিট রিপোর্ট এবং সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রকৌশল দলের সাহায্য নেওয়া হয়। ক্যাবের প্রকৌশলীরা সরেজমিনে ইন্দোনেশিয়া গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কার্গো বিমান দুটির আমদানির ছাড়পত্র প্রদান করে। ব্যাংক ঋণপত্রে উল্লেখিত নির্ধারিত মূল্যের বিল অব এন্ট্রি রিসিভ করে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে রক্ষিত বিল অব এন্ট্রির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।’
বাস্তবতার সঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংকের এই বক্তব্যেরও মিল নেই। যুক্তরাজ্যের এয়ারাক্রাফট মার্কেটিং এজেন্ট প্রতিষ্ঠান স্কাই ওয়ার্ল্ড এভিয়েশনের ওয়েবসাইটে ২০১৫ সালের ১০ আগস্টে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরে পুরনো ফকার-৫০ বিক্রয় হয়েছে ২ মিলিয়ন ডলারের নিচে। অথচ ট্রাস্ট ব্যাংক একটি ফকারের জন্য ৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড় দামের চেয়েও তিনগুণ বেশি দামে একটি ফকার-৫০ এর জন্য এলসি খোলায় পাচারকারীরা দেশ থেকে অর্থ সরানোর সুযোগ পেয়েছে। মূলত স্কাই ক্যাপিটালের চুক্তি অনুযায়ী একটি ফকারের ক্রয়মূল্য ছিল ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার।
বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীন আচরণ কিংবা পাচারে সহযোগিতার কারণে ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে বলে ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে।
সংবাদে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাস্ট ব্যাংক জড়িত না থাকলে পাচার সম্ভব হতো না।
পাশাপাশি ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, এই ঘটনায় তাদের একার দায় নেই। টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদেও উল্লেখ করা হয়েছে, এই পাচারের ঘটনায় ট্রাস্ট ব্যাংকসহ রাজস্ব বোর্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে।
প্রতিবাদলিপিতে ট্রাস্ট ব্যাংক আরও দাবি করে, ‘উক্ত গ্রাহকের নামে ঋণপত্র খোলা এবং উক্ত ঋণ সংক্রান্ত সকল লেনদেনে প্রচলিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা ব্যাংক যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে। বর্তমানে উক্ত গ্রাহকের ঋণ সম্পর্কিত বিষয়টি দুদক কর্তৃক তদন্তাধীন আছে এবং বিচারে এটি আদালত কর্তৃক নিষ্পত্তি হবে।’
এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অর্থ পাচারের অভিযোগ আমলে নিয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন থাকার পরও স্কাই ক্যাপিটালের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে অব্যাহত ঋণসুবিধা পাচ্ছে। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ হিসাব বলছে, গত ১০ মাসে ট্রাস্ট ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার এলসি সুবিধা নিয়েছে স্কাই ক্যাপিটালের বেশ কয়েকটি সিস্টার কনসার্ন।
ট্রাস্ট ব্যাংক আরও লিখেছে, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ উক্ত সংবাদে প্রকাশিত মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে সংবাদটি নিউজ পোর্টাল থেকে প্রত্যাহার সহ ব্যাংকের প্রতিবাদমূলক সংবাদটি উক্ত পোর্টালে এবং পত্রিকায় প্রথম অথবা শেষ পাতায় দৃষ্টি গোচরীয় স্থানে একই সাথে প্রকাশের জোর দাবি জানাচ্ছে।’
সকল তথ্য-প্রমাণ প্রকাশিত সংবাদটির শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করলেও ট্রাস্ট ব্যাংক কর্তৃক সংবাদটি ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে ওয়েবসাইট থেকে সরানোর দাবি তুলে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছে টাইমস। সংবাদে প্রমাণিত সত্যকে ‘মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত’ বলায় ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ব্যাংকের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিপ্রায়ে নয়, দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা পাচারকারী ও পাচারে সহায়তাকারীদের আইনের আওতায় এনে দেশের অর্থপাচার রোধ করার উদ্দেশ্যে জনস্বার্থে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বিদ্যমান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অর্থ পাচারে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ অনেক দেশে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গত ২১ অক্টোবর টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছিল, ৩টি বিমান ক্রয়ের আড়ালে ট্রাস্ট ও রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছে স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইন্স লিমিটেড।


