এবারের ঈদুল আজহায় আরও একবার বড় ধরনের মন্দার মুখোমুখি হয়েছে দেশের চামড়া শিল্প। ব্যবসায়ীরা অসহায় হয়ে দেখছেন কিভাবে চামড়ার দাম ধসে পড়ছে, কীভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া অবিক্রিত থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে না পারায় যে দূষণ ঘটছে, তার কারণে ইউরোপের ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও কাঁচা চামড়ার চাহিদা কমে গেছে।
এসব সমস্যা জানা থাকার পরেও সিইটিপি সম্প্রসারণ কিংবা নতুন শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা আটকে আছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই খাতের বিপুল রপ্তানি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের কার্যকর তদারকি এবং সমস্যা সমাধানে উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংকটের মূলে রয়েছে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর ব্যর্থতা। বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ কমাতে ঢাকা শহরের হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তরের জন্য ২০০৩ সালে সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। শুরুতে দুই বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় ১৫ বছর সময় লেগে যায়। এর ফলে প্রকল্পের খরচ ১৭৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫ কোটি টাকায়।
২০১৭ সালে প্রায় ১৬০টি ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরিত হয়। পরিকল্পনায় ছিল তরল ও কঠিন বর্জ্য কেন্দ্রীয়ভাবে শোধন করা হবে এবং এই শিল্প অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র একটি ট্যানারি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ পেয়েছে। ফলে বাকি ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না।
সাভারে ২০১২ সালে শুরু হয় সিইটিপি নির্মাণ কাজ। পাঁচ বছরের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করতে সময় লাগে নয় বছর।
ট্যানারি মালিক ও শিল্প প্রতিনিধিরা জানান, ২০২১ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার পরেও সেন্ট্রাল ক্রোম রিকভারি ইউনিট, সেন্ট্রাল সেডিমেন্টেশন সিস্টেম এবং টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বছরের পর বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল।
এর ফলে সিইটিপি কখনই প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অর্জন করতে পারেনি, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানির সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, নকশাগত ত্রুটির কারণেই সিইটিপি আশানুরূপ ফলাফল দিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো থেকে কী পরিমাণ তরল ও কঠিন বর্জ্য তৈরি হতো, তার একটি ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই শোধনাগারটি তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি জানান, সিইটিপি কখনই এই শিল্পনগরীর প্রকৃত চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিল না। এ ছাড়া এটি নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা চীনা প্রতিষ্ঠানটি সঠিকভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ না করেই বিসিকের কাছে শোধনাগারটি হস্তান্তর করে দেশ ছেড়ে চলে যায়।
সরকারি নথিতে দাবি করা হয়েছে, এই প্ল্যান্টটি প্রতিদিন ২৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এর শোধন ক্ষমতা সব সময়ই ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ঘনমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই ঘাটতির কথা স্বীকার করেন সিইটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম শাহনেওয়াজ।
সাধারণ দিনগুলোতে ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৮ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য তৈরি হয়। আর ঈদুল আজহার কোরবানির মৌসুমে এই পরিমাণ বেড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার ঘনমিটারে পৌঁছায়। ফলে বিপুল পরিমাণ অশোধিত বা আংশিক শোধিত বর্জ্য প্রতিনিয়ত নদীতে গিয়ে পড়ছে।
হাজারীবাগ স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষা করা। কিন্তু এখন সেই শিল্প বর্জ্য সাভারের ধলেশ্বরী নদীকে দূষিত করছে। এর পাশাপাশি সিইটিপির পুরনো হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি ঘন ঘন নষ্ট হচ্ছে। পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে এগুলোর প্রতিস্থাপন ও আধুনিকীকরণ আটকে আছে।
এই প্ল্যান্টের বর্জ্য বহনকারী পাইপলাইনগুলোর নকশাও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ফলে অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ এগুলো সহ্য করতে পারে না। বেশ কয়েকজন ট্যানারি মালিক জানান, এই শিল্পনগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই অপর্যাপ্ত। হাজারীবাগে যেখানে চার থেকে পাঁচ ফুট গভীর ড্রেন ছিল, সাভারে তার অর্ধেক গভীরতার ড্রেন তৈরি করা হয়েছে। ফলে বর্জ্যের চাপ বাড়লে অশোধিত বর্জ্য ড্রেন উপচে সরাসরি নদীতে চলে যায়।
এর অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। বিসিকের সূত্র অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটার বর্জ্য শোধনে প্রকৃত খরচ হয় প্রায় ৫৩ টাকা। কিন্তু ট্যানারিগুলোর কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫ টাকা। এই মডেলে সিইটিপি দীর্ঘ মেয়াদে কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা সন্দেহ প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় রপ্তানি সীমিত
বিশ্ব চামড়া বাণিজ্যে ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদকে একটি প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডগুলো মূলত এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ট্যানারি থেকেই চামড়া সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণে বাংলাদেশের অনেক ট্যানারি ইউরোপ ও আমেরিকার লাভজনক বাজারগুলোতে প্রবেশ করতে পারছে না।
ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি করতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান চীনে কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দাম সম্ভাব্য বাজার মূল্যের চেয়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কম। এর ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশ চামড়া খাত থেকে আনুমানিক ৫ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারাচ্ছে। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে কিছু ট্যানারি বিদেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানি করছে।
মোহাম্মদ সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, একটি বিশ্বমানের সিইটিপি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা না গেলে চামড়া শিল্প রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
সমাধান কী?
ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সাভারের সিইটিপি কার্যকর করতে হলে এতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের কাজ বছরের পর বছর ধরে বন্ধ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, সিইটিপি পুরোপুরি সচল করতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, সরকার একসময় অনুদান দেওয়ার কথা বললেও পরে সেই পরিকল্পনা বদলে সিইটিপি পরিচালনাকারীদের ঋণ নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু এই ঋণের দায়ভার কে নেবে, তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি স্থবির হয়ে পড়ে।
সিইটিপির ওপর চাপ কমাতে সরকার শিল্পনগরীর কয়েকটি ট্যানারিকে নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করতে পেরেছে।
বিসিক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানান, ইটিপি স্থাপনে আরও ১০-১২টি ট্যানারিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে প্রয়োজনে ঋণসহ অন্যান্য সহায়তারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে আলাদা ইটিপি নির্মাণ করা অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব নয়। এমনকি যদি ব্যক্তিগত প্ল্যান্ট তৈরিও করা হয়, তাহলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারণ নিজস্ব ইটিপিতে কেবল তরল বর্জ্য শোধন করা সম্ভব হলেও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় সিইটিপির ওপরই নির্ভর করতে হবে।
সিইটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে একটি ইতালীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মূল্যায়ন করছে। এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য প্ল্যান্টের প্রকৃত ক্ষমতা নির্ধারণ এবং নকশাগত ত্রুটি চিহ্নিত করা।
তিনি বলেন, এই কাজ শেষ হলে উন্নতির জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাওয়া যাবে, যা সিইটিপিকে ইউরোপীয় মানের কাছাকাছি নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে।
চট্টগ্রামে কাঁচা চামড়ার সংকট
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এবারের ঈদুল আজহায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮ লাখের বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় আড়ত, নিলাম কেন্দ্র এবং ২২০টি মাদ্রাসার মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।
তবে সংগৃহীত এই বিপুল পরিমাণ চামড়া সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো এই অঞ্চলে নেই। ফলে উৎসবের দিনগুলোতে হঠাৎ চামড়ার সরবরাহ বেড়ে গেলে তা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না।
দুই দশক আগেও চট্টগ্রাম ছিল দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে জেলার ২২টি ট্যানারির প্রায় সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল রিফ লেদার লিমিটেড সীমিত পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালু রেখেছে।
এই প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক মোখলেসুর রহমান সতর্ক করে বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্যানারিগুলো যদি পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনরায় চালু করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া ব্যবস্থাপনা করা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকবে।


