বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের কালজয়ী গায়ক ও সুরকার শচীন দেব বর্মণের কুমিল্লার জন্মভিটা সংরক্ষণ ও সেখানে পূর্ণাঙ্গ একটি সংগীত জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা শচীনের ভিটেবাড়ি পরিদর্শন ও সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে।
সম্প্রতি কুমিল্লা নগরীর চর্থায় অবস্থিত শচীন এবং নবীনগরের শাস্ত্রীয় সংগীতের আচার্য সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পৈত্রিক বাড়ি দুটিকে ভবিষ্যতে জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য পরিদর্শন করে একটি প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন, জাতীয় জাদুঘরের কর্মকর্তা ও সংগীত জাদুঘর বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ সেরাজুল ইসলাম।
পরিদর্শন শেষে সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাড়ি দুটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে জাদুঘর করার পর্যাপ্ত যৌক্তিকতা রয়েছে। বিষয়টি আমরা মন্ত্রণালয়কে জানাব। আশা করি, শিগগিরই এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে এবং ঐতিহাসিক দুটি ভিটেবাড়ি দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে।’

ভিটেবাড়িতে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে শচীন দেবেন জীবন ও কর্মের দলিল চিত্র, সংগীত আর্কাইভ ও গবেষণা কক্ষ, মুক্তমঞ্চ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানস্থল ও সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার হাছিবুর রহমান পরাগ বলেন, ‘শচীন দেব বর্মণের ভিটে কেবল কুমিল্লার নয়, দেশের গৌরব। এখানে জাদুঘর হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রেরণা দেবে।’
এখানে সংগীত জাদুঘর স্থাপন করা হলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা শচীন দেব বর্মণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন বলে উল্লেখ করলেন ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল। এর মাধ্যমে কুমিল্লা জেলা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নতুন করে জায়গা করে নেবে, এমন প্রত্যাশা তার।
সংগীত গবেষকরা বলছেন, শচীনের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে গবেষণার জন্য এ ভিটেবাড়ি অমূল্য কেন্দ্র হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি দলিল, ছবি, নোটেশন এবং অডিও-ভিডিও আর্কাইভ ব্যবহার করতে পারবেন। এতে সংস্কৃতির ইতিহাস চর্চা সমৃদ্ধ হবে।
শচীনের বসতবাড়ি এক সময় ছিল প্রায় ৬০ একর জমির ওপর স্থাপিত প্রাসাদ। পাকিস্তান আমলে এর একটি অংশ সরকারি খামার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পরও ভিটেবাড়ি দখল, অবহেলা ও ধ্বংসের শিকার হয়। রাজবাড়ির অনেক অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয় সাংস্কৃতিক মহলের তাগিদে ১৯৯০-এর দশক থেকে সংরক্ষণের দাবি জোরালো হয়।
২০১২ সাল থেকে শচীনের ভিটেবাড়ি সংরক্ষণের জন্য কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে কাজ শুরু করে। ২০১৪ সালে এই জায়গার একটি অংশ উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। এরপর আংশিক সংস্কার করা হলেও পূর্ণাঙ্গ রূপায়ণ হয়নি। ২০১৮ সাল থেকে স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হয় ‘শচীন মেলা’। ২০১৯ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ভিটেবাড়ির ভেতরে শচীনের ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।


