জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতা অবলম্বনে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল একই নামে সিনেমা বানিয়েছেন। ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাজিবা বাশার। সিনেমাটির প্রচারণায় সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন টাইমস অব বাংলাদেশের অফিসে। কথা বলেছেন পেইজ থ্রির সঙ্গে।
‘বনলতা সেন’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন কীভাবে?
খুব অর্গানিকভাবে। উজ্জ্বল ভাইয়ের সঙ্গে আগে কখনো কাজ হয়নি। উনার কাস্টিং ডিরেক্টর আমাকে ফোন দেন। আমি আগে থেকেই উনার কাজের ভক্ত ছিলাম, বিশেষ করে ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’ আমার খুব প্রিয়। তাই যখন শুনলাম উনি নতুন সিনেমা করছেন, তখনই আগ্রহী হয়েছিলাম।
তারপর স্ক্রিপ্ট পড়লাম। জীবনানন্দ দাশ আমার খুব প্রিয় কবি। চরিত্রটা ভালো লাগল, অডিশন দিলাম, সেখান থেকেই যুক্ত হওয়া।
সিনেমাটিতে আপনার চরিত্রটি সম্পর্কে জানতে চাই, যতটুকু বলা যায়।
চরিত্র সম্পর্কে আসলে খুব বেশি বলা মানা। তবে এতটুকু বলতে পারি, এখানে প্রত্যেকটা নারী চরিত্রের মধ্যেই একটা মিস্ট্রি আছে। শুধু মিস্টেরিয়াস না, তারা খুব স্ট্রং ফিমেল ক্যারেক্টারও। উজ্জ্বল ভাইয়ের যে জিনিসটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সেটা হলো ক্যারেক্টারাইজেশনের গভীরতা। প্রত্যেকটা নারী চরিত্রের আলাদা একটা স্তর আছে, আলাদা চমক আছে।
‘বনলতা সেন’ তো জীবনানন্দ দাশের খুব বিখ্যাত কবিতা। পাঠকদের মনে এই চরিত্র নিয়ে আলাদা একটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন আছে। সেই জায়গা থেকে আপনার চরিত্রটা কতটা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে বলে মনে করেন?
আমার চরিত্রটা আসলে সরাসরি কবিতা থেকে আসেনি। কবিতার বাইরের একটা জগৎ আছে এখানে। তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যেমন পাঠকরা কবিতা পড়ে নিজেদের মতো করে বনলতা সেনকে কল্পনা করেন, সিনেমা দেখেও তেমন অনুভূতি হবে। দর্শক প্রত্যেকটা চরিত্রকে দেখে প্রশ্ন করবে, নিজের মতো করে ভাববে। রহস্যটা থেকেই যাবে।
আপনার চরিত্রটা কি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল? বাস্তবের মত এখানেও কি কর্মজীবী নারী?
চরিত্রটা খুব ইন্টেলিজেন্ট, স্ট্রং, ইন্টেলেকচুয়াল ধরনের। মজার ব্যাপার হলো, এই চরিত্রের সঙ্গে আমি নিজের অনেক মিল খুঁজে পেয়েছি। আমি সাধারণত কোনো চরিত্র হাতে পেলে আগে দেখি, আমার সঙ্গে তার মিল কোথায়। এখানেও সেটা পেয়েছি।
তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল সংলাপ। উজ্জ্বল ভাই খুব কমপ্লিকেটেড সংলাপ লেখেন। শুধু কঠিন না, খুব প্রিসাইজ। আপনি চাইলে ইম্প্রোভাইজ করতে পারবেন না। কারণ সংলাপের বাইরে গেলেই ক্যারেক্টারের টোন নষ্ট হয়ে যায়। আমরা অনেক সময় অন্য স্ক্রিপ্টে স্বাধীনতা পাই, কিন্তু এখানে সেই জায়গাটা খুব নিয়ন্ত্রিত ছিল।
আপনি খুব বেছে বেছে কাজ করেন। গল্প বা কাজ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়টাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন?
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্ক্রিপ্ট। স্ক্রিপ্ট স্ট্রং হতে হবে, কনটেন্ট স্ট্রং হতে হবে। কে অভিনয় করছে সেটা আমি খুব একটা জিজ্ঞেস করি না। আমি বিশ্বাস করি, ভালো পরিচালক ভালো স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করলে তার টিমও ভালো হবে।
আর একটা জিনিস সবসময় ভাবি—কাজটা দর্শকের মনে কী রেখে যাবে। সব কাজ যে অ্যাক্টিভিজম হবে, এমন না। কিন্তু কিছু একটা তো অর্জন করতে হবে। দর্শক যেন ভালো কিছু নিয়ে বের হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা বেড়েছে। একজন শিল্পী হিসেবে এই বিষয়ে আপনাদের কী কী ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন?
আমার মনে হয়, শিল্পীরা সবসময় চান তাদের কাজ থেকে সমাজে ভালো কিছু প্রভাব পড়ুক। শিল্প নিজেই খুব রাজনৈতিক একটা ব্যাপার। যুগ যুগ ধরে আমরা দেখেছি, শিল্প সমাজে প্রভাব ফেলে।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা যদি শুধু বলি মানুষের রুচি খারাপ, তারপর আবার সেই রুচির জন্যই কাজ বানাতে থাকি, তাহলে তো দ্বিচারিতা হয়ে যায়। অনেক সিনেমায় আমরা সহিংসতা বা ধর্ষণকে গ্লোরিফাই করেছি, রোমান্টিসাইজও করেছি। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এখন বাণিজ্যিক সিনেমায় ‘আলফা মেল’ চরিত্রের একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের চরিত্র কি দর্শকের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে?
অবশ্যই ফেলে। বড়রা হয়তো বুঝতে পারে কোন প্রভাব গ্রহণ করবে আর কোনটা করবে না। কিন্তু একটা টিনএজ ছেলে যদি এসব দেখে, সে তো সেই চরিত্রের মতো হতে চাইতেই পারে।
আমি ছোটবেলায় দেখেছি, কিছু ইংলিশ সিনেমার চরিত্র দেখে আমার সহপাঠীরা বলত, ‘আমি ওর মতো হতে চাই।’ এখনকার তরুণরাও একইভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তাই এটা আমাদের দায়িত্ব।
তবে এর মানে এই না যে এই ধরনের সিনেমা হবে না। অবশ্যই হবে। কিন্তু বয়স অনুযায়ী দেখা উচিত। সার্টিফিকেট দেওয়ার পরেও যদি বাচ্চারা ঢুকে পড়ে, সেখানে হল মালিক, পরিবার—সবার দায়িত্ব আছে। ট্রেলার দেখেননি, রিভিউ পড়েননি, তারপর বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে অভিযোগ করলে তো হবে না। শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।


