চট্টগ্রাম-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সারোয়ার আলমগীরের বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই গেজেট প্রকাশ ও শপথ পড়ানো নিয়ে সোমবার আপিল বিভাগে তীব্র প্রশ্ন তোলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। শুনানির একপর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার মধ্যে প্রকাশ্য বাক্যবিনিময় হয়, যা আদালতকক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
আদালতে উপস্থিত একাধিক সূত্র টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, সোমবার সকালে চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বক্তব্য উপস্থাপনের অনুমতি চান।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, হাইকোর্টের রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই কীভাবে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করল এবং শপথের ব্যবস্থা হলো?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি সিইসিকে বলেছেন, আদালতের রুল বা নির্দেশনার ভিত্তিতে যেভাবে অনেক সময় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেখেই নির্বাচন কমিশন প্রতীক বরাদ্দ দেয়, একইভাবে এ ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, দুটি পরিস্থিতি এক নয়। নির্বাচন কমিশন যদি একটি ভুল করে থাকে, তবে সেই ভুলের ধারাবাহিকতা চলতে পারে না। তিনি মন্তব্য করেন, আদালতের আদেশ লিখিতভাবে প্রকাশের আগে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, অথচ আদেশ পরিবর্তিতও হতে পারত। দ্রুততার প্রয়োজন থাকলে আদালতের কাছে রায় দ্রুত প্রকাশের আবেদন করা যেত, কিন্তু তা না করে আগেভাগেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনারা যদি ‘একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য’ আদেশ দেন, তাহলে তো কিছু করার নেই।
এই মন্তব্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘এটা কি বললেন আপনি? একপক্ষকে সুবিধা দেওয়া বলতে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? আমরা কীভাবে একপক্ষকে সুবিধা দেবো? আদালতের আদেশ আপনার পছন্দ না হলেও আপনি তা মানতে বাধ্য।’
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘আপনি বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল হয়ে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতিকে এ কথা কীভাবে বললেন? টেক ইওর সিট। প্লিজ, টেক ইওর সিট। ডোন্ট সে লাইক দিস। উই ডোন্ট লাইক ইট।’
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় আদালতকক্ষে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতি একাধিকবার অ্যাটর্নি জেনারেলকে আসনে বসতে বলেন এবং একপর্যায়ে মন্তব্য করেন, ‘আপনি বসেন, আপনার কথা আর শুনব না।’
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমার কথা শুনবেন না, কিন্তু আমার তো কথা আছে।’
প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, ‘আপনি সারাদিন বলবেন নাকি? আপনার কথা কি আমরা সারাদিন শুনব?’
পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে আসনে বসার অনুরোধ জানান।
আদালতে সারোয়ার আলমগীরের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী আহসানুল করিম ও এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। আবেদনকারী মুহাম্মদ নুরুল আমীনের পক্ষে ছিলেন মোহাম্মদ শিশির মনির ও আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর নতুন বিরোধ
মামলার নথি অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচনে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করলে ঋণ খেলাপের অভিযোগ তুলে কমিশনে আপিল করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমীন। ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বাতিল করে।
ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে ২৭ জানুয়ারি আদালত নির্বাচন কমিশনের আদেশ স্থগিত করে তাকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়।
এরপর নুরুল আমীন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করলে ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত আপিলের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে সারোয়ার আলমগীরের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বহাল থাকলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি বেসরকারিভাবে বিজয়ী হলেও আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশের কারণে ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
পরে ১৬ জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টকে যত দ্রুত সম্ভব, সম্ভাব্য দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয় এবং আগের অন্তর্বর্তী আদেশ বহাল রাখে।
৯ জুলাই হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে। ওই দিনই তার পক্ষে গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং সন্ধ্যায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন।
এরপর ১৩ জুলাই নুরুল আমীন আপিল বিভাগে আবেদন করে হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সারোয়ার আলমগীরের সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা চান। আবেদনে বলা হয়, রায়ের লিখিত অনুলিপি প্রকাশের আগেই গেজেট প্রকাশ ও শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়েছে।
সোমবার সেই আবেদনের শুনানি শেষে আপিল বিভাগ মঙ্গলবার আদেশ ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছে।


