যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি শেষের খুব কাছাকাছি, হ্যাঁ।’
তার দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু না করলে, দেশটি এতদিনে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করত।
ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, তাহলে আপনারা সবাই তাদের “স্যার” বলে সম্বোধন করতেন। আর আপনি সেটা চাইবেন না বলেই মনে হয়।’
‘যুদ্ধটি খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে ইরানের ২০ বছর সময় লাগতে পারে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা এখনো শেষ করিনি। দেখা যাক কী হয়… আমার মনে হয় তারা খুব মরিয়া হয়ে একটি চুক্তি করতে চায়।’
এর আগে নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আগামী দুই দিনের মধ্যে ফের শান্তি আলোচনা শুরু হতে পারে। পাকিস্তানের আহ্বানে এবং ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ দেওয়ার পর তেহরানের পক্ষ থেকেও দ্বিতীয় দফার বৈঠকের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইরানের কূটনীতিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সেখানেই (ইসলামাবাদে) থাকা উচিত, কারণ আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু ঘটতে পারে। আমরাও সেখানে যাওয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছি।’
পাকিস্তান, ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কূটনীতিকরাও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচক দল চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে আবার ইসলামাবাদে ফিরতে পারে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, এখনো বৈঠকের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ ঠিক হয়নি।
একই দিনে জর্জিয়ায় এক অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কোনো “ছোট বা স্বল্পমেয়াদি” চুক্তি করতে আগ্রহী নন, তিনি চান “বিস্তর সমঝোতা”। তবে দুই দেশের মধ্যে একে অপরের প্রতি এখনো গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। এই সমস্যা এক রাতে সমাধান করা সম্ভব নয়।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় কোনো সমঝোতা হয়নি, ফলে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির এখনও এক সপ্তাহ বাকি রয়েছে।
পাকিস্তানের কূটনীতিকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে চুক্তি না হওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিই অন্যতম প্রধান জটিলতা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম আগামী ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরান ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ রাখতে রাজি হয়েছে।
এ ছাড়া আলোচনায় ইরানের মাটিতে থাকা সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়ার দাবিও জানায় যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে ইরান তাদের ওপর থাকা সব ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানায়, যা যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে নিশ্চিত করতে পারবে না।
আলোচনার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসলামাবাদে বৈঠকের পর দুই দেশের সঙ্গে গোপন আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এটিই দুই পক্ষকে একটি সম্ভাব্য চুক্তির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্রুত কোনো পারমাণবিক চুক্তি হওয়া কঠিন। কারণ, দুই দেশের মধ্যে ২০১৫ সালের জটিল পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্পই তার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে সরে আসেন। তাছাড়া নতুন কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তদারকি ও যাচাইও প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চুক্তির শর্তে রাজি হলেই হবে না, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থারও ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, অবরোধ কার্যকর হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কোনো জাহাজ ইরানের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি এবং ইরানের অনুমোদিত ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজকে মার্কিন সেনারা জোরপূর্বক ফিরিয়ে দিয়েছে।
তবে সমুদ্র গবেষণা সংস্থা বলছে ভিন্ন কথা। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলে তেমন প্রভাব পড়েনি, মঙ্গলবারও অন্তত আটটি জাহাজ ওই পথ অতিক্রম করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিরুদ্ধে ইরান কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানালেও, দুই দেশের মধ্যে ফের কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তেলের বাজারকে কিছুটা স্থিতিশীল করেছে। এরইমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথে পাঁচ শতাধিক নৌযান আটকে আছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।


