কেউ হারিয়েছেন ভাই, কেউ বাবা, আর কেউবা সন্তান। তারা নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও তাদের পরিবারের জন্য বিচারের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি নিজেদের বুকের এই চাপা আর্তনাদ প্রকাশ্য আক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরার পথও রুদ্ধ।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও নিহত ৪৪ জন পুলিশ কর্মকর্তার পরিবার ক্ষোভ, শোক ও হতাশার পাশাপাশি তীব্র আর্থিক অনটন ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারে কোনো মামলা বা আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করে অপরাধীদের আইনি দায়মুক্তি দেয়। কিন্তু আইনের সীমানা দিয়ে কি স্বজনহারানো মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে বেঁধে রাখা সম্ভব?
নিহত সাব-ইন্সপেক্টর তাহসানুজ্জামানের ছেলে রাফি বলেন, “অসংখ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারানোর পরও বিচারের প্রক্রিয়ায় কোনো অগ্রগতি না হওয়াটা অত্যন্ত হতাশাজনক।”
নিহতদের অনেকেই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি। ফলে তাদের পরিবারগুলো এখন সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন সংসার চালাতে চরম হিমশিম খাচ্ছে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, গত দুই বছরে মানবিক দিক বিবেচনা করেও সরকারের তরফ থেকে কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি কিংবা নিয়মিত কোনো যোগাযোগও রাখেনি।
দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আড়াই মাস পর নিহত পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকা প্রকাশ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই তালিকায় ছিলেন ৩ জন ইন্সপেক্টর, ১১ জন সাব-ইন্সপেক্টর, ৭ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর, ১ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট টাউন সাব-ইন্সপেক্টর, ১ জন নায়েক এবং ২১ জন কনস্টেবল।
নিহতদের মধ্যে ১৪ জন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি), ১৫ জন সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায়, ২ জন করে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানা, কুমিল্লার তিতাস থানা ও ঢাকা জেলা পুলিশে এবং অন্য ৯টি পুলিশ ইউনিটে ১ জন করে কর্মরত ছিলেন।
নিহত ৪৪ জনের মধ্যে ২৫ জনই প্রাণ হারিয়েছেন থানার ভেতরে কিংবা থানার ঠিক সামনে।
‘প্রতিটি দিন কীভাবে কাটাই, কেবল আমিই জানি’
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানা ভবনের ভেতরেই নিহত হন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর মো. ওবায়দুর রহমান।
তার স্ত্রী নিপা আক্তার এই প্রতিবেদককে বলেন, “যে মানুষটি আমার মাথার ওপরের ছাদ ছিলেন, তাকে হারিয়ে প্রতিটি দিন আমি কীভাবে পার করছি তা কেবল আমিই জানি। তিন সন্তানকে একাই মানুষ করছি। সরকার বা প্রশাসনের কেউ মানবিক খাতিরেও ন্যূনতম যোগাযোগটুকু আমাদের সঙ্গে রাখেনি।”
এনায়েতপুর থানার নিহত সাব-ইন্সপেক্টর মো. তাহসানুজ্জামানের ছেলে মো. রফিউজ্জামান রাফি বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের জীবনের সব অর্থ হারিয়ে গেছে। জীবনধারণের মৌলিক খরচ মেটাতেই এখন আমাদের চরম সংগ্রাম করতে হচ্ছে।”
সরকারি কোনো সাহায্য পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “পেনশনের টাকা ছাড়া আমরা আর কোনো ধরনের আর্থিক বা মানবিক সহায়তা পাইনি।”
ইন্সপেক্টর মো. আবদুর রাজ্জাকের স্ত্রী মাহফুজা বেগম বলেন, “সন্তানের খরচ জোগাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাদের সংসারের আর্থিক অবস্থা একেবারেই ভালো নয়।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ওইদিন সরকারের পতনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা থানা ঘেরাও করে হামলা চালায় এবং চারজন পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন কনস্টেবল আবদুল মজিদ।
তার স্ত্রী শাহজাদী বেগম বলেন, “দুই ছেলেকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করছি। আর্থিক বা মানবিক সহায়তার কথা বাদই দিলাম—আজ পর্যন্ত কেউ একটু সমবেদনা জানাতেও আসেনি।”
দায়মুক্তির কারণে স্থগিত তদন্ত
২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় চার পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন শাহজাদী বেগম।
তবে মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু বলেন, “এ ধরনের মামলার বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”
অন্যদিকে এনায়েতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদ হোসেন জানান, সেখানেও একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে, যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের যাবতীয় ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার অধ্যাদেশটিকে চূড়ান্ত আইনে পরিণত করে।
ফলে পুলিশ সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ কার্যত চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে নিপা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, “আমার স্বামীর হত্যার বিচার কোনোদিন হবে না। আমরা কার কাছে বিচার চাইব? আর কেইবা আমাদের বিচার এনে দেবে?”
তবে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, দায়মুক্তিই শেষ কথা নয়।
তিনি বলেন, “অতীতের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়—বিভিন্ন সময়ে দায়মুক্তি সংক্রান্ত অধ্যাদেশ পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়েছে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
বিষয়টিকে অত্যন্ত জটিল উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “এমনকি কয়েক বছর পর যদি বিচার প্রক্রিয়া শুরুও হয়, তাহলেও বহু ক্ষেত্রে সাক্ষীদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশের বাস্তবতায় ফৌজদারি মামলার প্রায় ৮০ শতাংশ আসামি শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায়। সেই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়েই থেকে যায়।”


