আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় ব্যবসাবান্ধব ও সহায়ক করব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
শনিবার ঢাকার আগাঁরগাওয়ে এনবিআর ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি একাধিক সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনটি।
এমসিসিআই জানায়, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের শিল্পখাত কঠিন সময় পার করছে।
বিশেষ করে ১২–১৪ শতাংশ উচ্চ সুদের হার ও ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে গেছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন বাজেট যেন ‘শাস্তিমূলক’ না হয়ে ‘সহায়ক’ হয়—এ দাবি জানায় সংগঠনটি।
কর ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার দিক তুলে ধরে এমসিসিআই জানায়, দেশে ১ কোটির বেশি ই-টিআইএনধারী থাকলেও নিয়মিত কর রিটার্ন জমা দেন অর্ধেকেরও কম করদাতা।
দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থনীতি এখনও অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর হওয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন করদাতা বাড়াতে বছরে ১০০ থেকে ১ হাজার টাকার প্রতীকী ন্যূনতম কর চালু এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক সহজ রিটার্ন দাখিল পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এছাড়া কার্যকর করহার অনেক ক্ষেত্রে ঘোষিত হারের তুলনায় ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করে সংগঠনটি। অগ্রিম আয়কর, উৎসে কর এবং বিভিন্ন শর্তের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। তাই শর্তহীনভাবে কর্পোরেট করহার কমানো এবং প্রকৃত আয়ভিত্তিক করব্যবস্থায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়ে এমসিসিআই আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের জন্য পৃথক প্ল্যাটফর্মের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ‘ইউনিফাইড ট্যাক্সপেয়ার প্রোফাইল’ চালুর প্রস্তাব দেয়।
একইসঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থায় একাধিক হারের পরিবর্তে যৌক্তিক হার নির্ধারণ এবং ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট স্বয়ংক্রিয় করার সুপারিশ করা হয়।
বর্তমান বাধ্যতামূলক পিএসআর ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব নয় উল্লেখ করে এটি সরল ও ডিজিটাল যাচাইযোগ্য করার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন এবং পুঁজি পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করে সংগঠনটি।
এসএমই খাতের জন্য আলাদা ও সহায়ক কর কাঠামো, টার্নওভার কর কমানো, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক যৌক্তিকভাবে কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। এমসিসিআই মনে করে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।
সংগঠনটি আরও জানায়, কর নীতি ও কর প্রশাসনের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন নিশ্চিত করা গেলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে, যা বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হবে।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় এমসিসিআই আশা প্রকাশ করে, সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও এনবিআরের কার্যকর ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।


