বরিশালের উজিরপুরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ কর্মীর গ্রেপ্তার ও কারাবাস—প্রথম দর্শনে হয়তো নিছক একটি আঞ্চলিক খবর। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিতদের কাছে এটি এক পুরনো রোগের পুনরাবৃত্তি; রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা দমনের প্রবণতা।
পুলিশ জানায়, ৫০ বছর বয়সী শওকত বালী ওরফে শাওন, যিনি স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার হন। তবে তারেক রহমানকে কটূক্তির অভিযোগে নতুন কোনো মামলা হয়নি; পরিবর্তে বিএনপির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের একটি পুরনো মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এই ঘটনাকে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে আরেকটি বিষয়—তারেক রহমান এখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেননি। অথচ তার সমালোচকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ শুরু হলে, ক্ষমতায় গেলে এর মাত্রা কতটা বাড়তে পারে তা নিয়ে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনা বিএনপির জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ফাঁদ কি না, সে প্রশ্নও উঠছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতার পালাবদল প্রায়শই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত এবং বিরোধী কণ্ঠ দমন করে। শেখ হাসিনা বা শেখ মুজিবুর রহমানের সমালোচনা করলে আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশি হয়রানি, মামলা বা গ্রেপ্তার ছিল সাধারণ বিষয়। দলীয় অতি উৎসাহী কর্মীদেরও এমন পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের শেষ দিকে সমালোচনা দমন প্রক্রিয়া জনঅসন্তোষ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আজ উজিরপুরের ঘটনা একই সংস্কৃতির প্রতিধ্বনি—শুধু চরিত্র বদলেছে, কিন্তু আচরণ অপরিবর্তিত।
এ প্রবণতা কেবল বাংলাদেশের নয়। পাকিস্তানে ইমরান খানের আমলে বিরোধীদের রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে; ভারতে প্রধানমন্ত্রীকে ‘অপমানের’ অভিযোগে রাজনৈতিক কর্মীরা গ্রেপ্তার হয়েছেন; তুরস্কে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানকে অপমানের অভিযোগে হাজারো মানুষ কারাদণ্ডের মুখে পড়েছেন। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দুর্বল হলে রাজনৈতিক অতি উৎসাহ দ্রুতই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে।

উজিরপুরের ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—বিএনপি এখনো ক্ষমতায় নেই, অথচ ইতোমধ্যেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা এক ধরনের ‘ছায়া-প্রশাসন’ এর সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। একবার এ সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গেলে ক্ষমতায় গিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে—বরং আরও গভীর হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে নেওয়া হয় নির্বাচনের আগে কোনো প্রার্থী বা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য, যাতে তাদের ‘অসহিষ্ণু’ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের উচিত হবে স্পষ্টভাবে জানানো যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তার অন্যতম রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে এমন পদক্ষেপকে সমর্থন করেন না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শর্ত। ২০২৪ সালে ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ বাংলাদেশকে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৫তম স্থানে রেখেছে; প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের জন্য হুমকি, আইনি হয়রানি ও রাজনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরের ফ্রিডম হাউসের রিপোর্টে বাংলাদেশকে ‘আংশিক মুক্ত’ বলা হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতায় স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা নথিভুক্ত রয়েছে।
গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনার জবাব আসে রাজনৈতিক বিতর্ক ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে, পুলিশি পদক্ষেপে নয়। শেখ হাসিনা আমলে যেমন প্রশ্ন উঠেছিল—‘শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনা কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে?’—আজ একই প্রশ্ন তারেক রহমান বা খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
যদি বিএনপি সত্যিই ক্ষমতায় এসে ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে চায়, তবে প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে এই অতি উৎসাহী দমননীতিকে প্রত্যাখ্যান করা। দলের ভেতরে সমালোচনা গ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় আচরণবিধি প্রণয়ন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো—এসবই হতে পারে নতুন সংস্কৃতির ভিত।
উজিরপুরের ঘটনাটি আকারে ছোট হলেও এর প্রতীকী তাৎপর্য গভীর। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু অন্ধত্ব তোষণ ও অতি উৎসাহ। এই ফাঁদ এড়িয়ে চললেই নেতৃত্ব টিকে থাকতে পারে কেবল জনগণের আস্থায়।


